সার্ক গঠনে ভারতের ভূমিকা আলোচনা করো

সার্ক গঠনে ভারতের ভূমিকা আলোচনা করো

সার্ক গঠনে ভারতের ভূমিকা আলোচনা করো
সার্ক গঠনে ভারতের ভূমিকা আলোচনা করো

সার্ক গঠনে ভারতের ভূমিকা

যেদিন থেকে সার্কের পথচলা শুরু হয়, সেদিন থেকে ভারত ধারাবাহিকভাবে সার্কে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। ১৯৮৫ খ্রিস্টাব্দ থেকে আজ পর্যন্ত সার্কের ১৮টি শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর মধ্যে দু-বার নতুন দিল্লিতে এবং একবার ব্যাঙ্গালোরে শীর্ষ সম্মেলন হয়েছে (দ্বিতীয় শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে ১৭-১৮ নভেম্বর ১৯৮৬, ব্যাঙ্গালোর; অষ্টম শীর্ষ সম্মেলন ২-৪ মে ১৯৯৭, নতুন দিল্লি এবং চতুর্দশ শীর্ষ সম্মেলন ৩-৪ এপ্রিল ২০০৭, নতুন দিল্লি)।

ভারতের কৌশলগত অবস্থান:

জন্মলগ্ন থেকেই ভারত সার্কের ভূমিকা ফলপ্রসূ করে তুলতে উদ্যোগ নেয়। দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলে ভারত হল সবদিক থেকে শক্তিশালী রাষ্ট্র। আয়তন, জনসংখ্যা, প্রাকৃতিক সম্পদ, শিল্পায়ন ইত্যাদি সব ক্ষেত্রেই বাকি ছয়টি রাষ্ট্র থেকে ভারত অনেক এগিয়ে। তাই সার্কের ভূমিকা সাফল্যমণ্ডিত করে তুলতে ভারতকে গুরুদায়িত্ব পালন করতে হয়েছিল। বলা বাহুল্য ভারত সার্কের মঞ্চকে কাজে লাগিয়ে দক্ষিণ এশিয়া ও ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলকে শান্তির অঞ্চল হিসেবে গড়ে তুলতে উদ্যোগ নেয়। আবার দক্ষিণ এশিয়ায় আন্তঃরাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসবাদের ক্রমবর্ধমান সক্রিয়তা প্রতিরোধে ভারত সার্ককে ব্যবহার করে এই অঞ্চলের দেশগুলির সঙ্গে যৌথ ঘোষণাপত্র ও একাধিক চুক্তি স্বাক্ষর করে।

বাণিজ্য সম্প্রসারণে ভূমিকা:

সার্কভুক্ত দেশগুলি নিজেদের মধ্যে বাণিজ্যিক আদানপ্রদান বৃদ্ধির জন্য উদ্যোগ নেয় এবং SAPTA স্বাক্ষর করে। এই অঞ্চলের রাষ্ট্রগুলি যাতে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে আরও বেশি দ্বিপাক্ষিক আদানপ্রদানে সক্ষম হয় তার জন্য শুল্ক ও মাসুলের ক্ষেত্রে সংস্কার সধান করা ছিল SAPTA-এর উদ্দেশ্য। ২০০৪ সালে সার্কের ইসলামাবাদ (দ্বাদশ) শীর্ষ সম্মেলনে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ধাঁচে দক্ষিণ এশিয়ায় শুল্কমুক্ত বাণিজ্যের অঞ্চল গড়ে তোলার জন্য SAFTA স্বাক্ষরিত হয়। বস্তুত এর প্রতিটি ক্ষেত্রেই (SAPTA ও SAFTA) ভারতের সক্রিয় সমর্থন ও উদ্যোগ ছিল। ২০০৫ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত সার্কের ত্রয়োদশ সম্মেলনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংহ SAFTA চুক্তির বাস্তব রূপায়ণের উপর জোর দেন। বস্তুত ভারতীয় অর্থনীতির দ্রুত বিকাশের প্রয়োজনে এই উদ্যোগ প্রয়োজনীয় ছিল এবং যা ছিল গুজরাল ডকট্রিনের দ্বারা প্রভাবিত। অপেক্ষাকৃত দরিদ্র দেশগুলির জন্য (যেমন-নেপাল, ভুটান, মালদ্বীপ, বাংলাদেশ) ভারত নিজের বাজার নিঃশর্তভাবে খুলে দেওয়ার কথা ঘোষণা করে। দিল্লি শীর্ষ সম্মেলনের মূল বিষয় ছিল পারস্পরিক সংযোগবৃদ্ধি। এ ছাড়া, ভারত প্রতিবেশী দেশগুলিতে জাতীয় জ্ঞান নেটওয়ার্ক (NKN) সম্প্রসারণ করে প্রযুক্তিগত পরিসেবা সহজতর করে তুলেছে।

সার্কে ভারতের আধিপত্যমূলক ভূমিকা:

তবে মনে রাখা উচিত যে ২০০০ সালের সূচনা থেকে সার্ক সম্পর্কে ভারতের বিদেশনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন আসে। সার্কভুক্ত দেশগুলির অধিকাংশই ভারতকে এই অঞ্চলের বৃহৎ শক্তি হিসেবে মনে করে এবং ভারতের অভিপ্রায় সম্পর্কে সংশয়ের মধ্যে থাকে। প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলির সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে আলাপ-আলোচনা ও চুক্তির ক্ষেত্রে ভারতে স্ট্র্যাটেজি সম্পর্কে একটা উদ্বেগ তাদের থাকেই-বিশেষ করে অভিন্ন নদীগুলির জলবণ্টন, যৌথ সীমান্ত, দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ইত্যাদি সম্পর্কে তারা সতর্ক আচরণ করে। পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, নেপাল ও বাংলাদেশের নেতৃত্বাধীন সরকার অনেকসময় বিভিন্ন ইস্যুতে সার্কের বৈঠকে ভারতের সঙ্গে সহমত পোষণ করা তো দূরের কথা, ভারতের প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছে। সন্ত্রাসবাদ ও পরমাণু পরীক্ষার প্রশ্নে পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের দ্বৈরথ সার্কের মধ্যে ফুটে উঠেছে। আবার নেপালে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও মহাদেশীয় সমস্যা কিংবা বাংলাদেশের সঙ্গে গঙ্গা ও তিস্তার জলবণ্টন নিয়ে বিরোধ স্পষ্ট হয়েছে। অর্থাৎ ২০০০ সাল থেকে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক পরিবেশে এমন কিছু বিষয় উঠে এসেছে যেখানে প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলি ভারতের স্বাভাবিক কর্তৃত্বের মধ্যে সর্বদাই আধিপত্যের ছায়া দেখেছে। সার্কভুক্ত দেশগুলির এই ভারতভীতি এবং ভারত সম্পর্কে অবিশ্বাস সার্কের ভাগ্যকে নিয়ন্ত্রণ করেছে।

২০১৬ সাল থেকে সার্কের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভারতের বিদেশনীতির প্রচলিত ধারণাটি ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত হয়। ওই বছর ১৮ সেপ্টেম্বর ধর্মীয় সন্ত্রাসবাদী সংগঠন জইশ-ই-মহম্মদ জম্মু ও কাশ্মীরের উরি অঞ্চলের আর্মি ব্রিগেডের হেড কোয়াটারে জঙ্গি হানার ফলে ২৩ জন ভারতীয় সেনা প্রাণ হারায়। যার পরিণতিতে ভারতীয় সেনা ও সীমান্তরক্ষী বাহিনী নিয়ন্ত্রণ রেখা অতিক্রম করে পাকিস্তানের জঙ্গি ঘাঁটিগুলিতে আক্রমণ করে। সার্কের দুই শক্তিশালী রাষ্ট্র, ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে রণংদেহী মনোভাব সার্কের ভবিষ্যৎকে মেঘাচ্ছন্ন করে তোলে। এর বিষময় প্রভাব পড়ে ২০১৬ সালে ইসলামাবাদের প্রস্তাবিত সার্কের ১৯তম শীর্ষ সম্মেলনের উপর। ভারত এই সম্মেলন বয়কট করে। এ ছাড়া বাংলাদেশ, ভুটান, মালদ্বীপ, শ্রীলঙ্কা এবং আফগানিস্তানও ভারতকে অনুসরণ করে = সার্কের ১৯তম শীর্ষ সম্মেলনটি বয়কট করে। ফলে এখনও পর্যন্ত সেই বৈঠক অনুষ্ঠিত হতে পারেনি।

সার্কভুক্ত দেশগুলিতে চিনের প্রভাব বৃদ্ধি ও ভারত:

১৯৮৫ খ্রিস্টাব্দে সার্ক যখন প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন চিনের প্রধানমন্ত্রী কাও জিয়াং দক্ষিণ এশীয় রাষ্ট্রগুলির এই প্রয়াসকে অভিনন্দন বার্তা পাঠিয়ে ছিলেন। সার্কের পর্যবেক্ষক রাষ্ট্রগুলির মধ্যে অন্যতম হল চিন। ভারত প্রথম থেকেই দক্ষিণ এশীয় উপমহাদেশে চিনের উপস্থিতি বা হস্তক্ষেপের বিরোধী ছিল। ফলে চিনকে সার্কের পর্যবেক্ষক রাষ্ট্র হিসেবে রাখার সিদ্ধান্তে পাকিস্তানের সমর্থন ভারত কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেনি। তবে শেষপর্যন্ত চিন সার্কের পর্যবেক্ষক রাষ্ট্রের স্বীকৃতি লাভ করে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ২০১৬ সাল থেকে পরিবর্তিত দক্ষিণ এশীয় রাজনীতিতে ভারত এবং পাকিস্তান উভয় রাষ্ট্রই সার্ক সম্পর্কে তাদের দৃষ্টিভঙ্গীতে নতুন মাত্রা যুক্ত করে। এই সময় থেকে পাকিস্তান চিনের সঙ্গে তার পুরোনো সখ্যতা শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেয়। চিন কর্তৃক বালুচিস্তানে গদর বন্দরের আধুনিকীকরণ, অধিকৃত কাশ্মীরের মধ্য দিয়ে কারাকোরাম হাইওয়ে নির্মাণ ইত্যাদি এর উদাহরণ। অন্যদিকে শ্রীলঙ্কা, নেপাল ও মালদ্বীপের সঙ্গে চিন সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা করে। এই সকল ঘটনাবলি সার্কের ভবিষ্যৎকে অনিশ্চিত করেছে। আবার কোভিড পর্বে চিন সার্কের সদস্যদের মধ্যে পাকিস্তান, নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশকে নিয়ে একটি চক্র গড়ে তোলে যা ‘মিনি সার্ক’ নামে পরিচিত। বিগত এক দশকে ভারতের সঙ্গে প্রতিবেশী দেশগুলির সম্পর্ক ক্রমশ খারাপ হয়েছে, যদিও ভারত সার্কের সদস্য হিসেবে তার অঙ্গীকারগুলি পূরণে সচেষ্ট। তথাপি দেখা যায় যে চিন সার্কভুক্ত দেশগুলির উপর প্রভাব বিস্তারের উদ্দেশ্যে প্রযুক্তি, অর্থসাহায্য, ঋণের জোগান দিয়ে চলেছে পাকিস্তান, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, নেপাল ও মালদ্বীপের মতো রাষ্ট্রগুলিকে। একমাত্র ভুটান এখনও ভারতের সঙ্গে আছে।

চিনের আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ:

বর্তমানে ভারতের চারপাশে বন্ধুভাবাপন্ন দেশের অভাব প্রকট। বাংলাদেশে মহম্মদ ইউনুসের তত্ত্বাবধায়ক সরকার মূলত চিনপন্থী। ভারত বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাসবাদীদের বিরুদ্ধে কূটনৈতিক অভিযান চালালেও একমাত্র ইজরায়েল ও ইন্দোনেশিয়া ছাড়া কোনো গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র ভারতের সপক্ষে পাকিস্তানের নিন্দা করেনি। অন্যদিকে মালদ্বীপ চিনের প্রভাবে নিজ ভূখণ্ড থেকে ভারতীয় সেনাকে চলে যেতে বাধ্য করেছে। বলা যায়, চিনের উত্থান ভারতকে এতটাই আতঙ্কগ্রস্ত করেছে যে ভারত ঠান্ডাযুদ্ধপর্বে অনুসৃত জোটনিরপেক্ষতার নীতি পর্যন্ত ত্যাগ করেছে এবং সর্বব্যাপী প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। এই পরিস্থিতিতে ভারতে NDA সরকার বিগত কয়েক বছরে সার্ক সম্পর্কে অবস্থান বদল করেছে। ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের আধিকারিকগণ উপলব্ধি করেছেন যে এবার সার্কের কোনো বিকল্প বা সমান্তরাল সংস্থা দক্ষিণ এশিয়ার জন্য গড়ে তোলা উচিত মূলত চিনা হস্তক্ষেপ প্রতিরোধ এবং দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের নেতৃত্ব সুদৃঢ় করার জন্য। বর্তমানে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে এবং সার্কের অন্দরে নিজের প্রাসঙ্গিকতা ও প্রভাব অক্ষুণ্ণ রাখার জন্য ভারত BIMSTEC (Bay of Bengal Initiative for Multi-Sectoral Technical and Ecomomic Cooperation), BRICS এবং সাংহাই কোঅপারেশন অর্গানাইজেশন (SCO)-এ সক্রিয় হয়ে উঠতে চাইছে। এইগুলির মধ্যে BIMSTEC-এ প্রত্যক্ষভাবে দক্ষিণ ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়া এবং ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের উপকূলবর্তী দেশগুলির সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। এর সদস্যরাষ্ট্রগুলি হল ভারত, বাংলাদেশ, মায়ানমার, ভুটান, নেপাল, শ্রীলঙ্কা এবং থাইল্যান্ড। চিন ও পাকিস্তানকে BIMSTEC-এর সদস্য করা হয়নি। ১৯৯৭ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত BIMSTEC প্রথমে ছিল একটি কারিগরি ও প্রযুক্তিগত ক্ষেত্রে সহযোগিতার উদ্দেশ্যে গঠিত একটি সংগঠন। ভারত বর্তমানে এটাকে সার্কের বিকল্প সহযোগিতা সংস্থা হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছে।

আরো পড়ুন : রাষ্ট্রের প্রকৃতি – একাদশ শ্রেণির ইতিহাস প্রথম অধ্যায় প্রশ্ন উত্তর

আরও পড়ুন প্রয়োজনে
একাদশ শ্রেণির দ্বিতীয় সেমিস্টার রাষ্ট্রবিজ্ঞান সাজেশন 2025 | Class 11 Semester 2 Political Science Suggestion 2025 Click here
বিশ্বায়নের সাংস্কৃতিক প্রভাব আলোচনা করো Click here
বিশ্বায়নের কারণগুলি লেখো Click here
আদর্শবাদী তত্ত্বের মৌলিক বৈশিষ্ট্যসমূহ আলোচনা করো Click here

Leave a Comment