কনস্ট্যান্টিনোপলের পতনের কারণ আলোচনা করো

ভূমিকা
৪৭৬ খ্রিস্টাব্দে বর্বর জার্মান জাতির আক্রমণে পশ্চিম রোমান সাম্রাজ্যের পতন হলেও কনস্ট্যান্টিনোপলকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা পূর্ব রোমান সাম্রাজ্য বা বাইজানটিয়াম সাম্রাজ্য আরও প্রায় হাজার বছর টিকে ছিল। কিন্তু নানা রাজনৈতিক ঘাত-প্রতিঘাতে পূর্ব রোমান সাম্রাজ্যের শক্তিক্ষয় হতে থাকে। অবশেষে ১৪৫৩ খ্রিস্টাব্দে অটোমান তুর্কি সুলতান দ্বিতীয় মহম্মদ পূর্ব রোমান সম্রাট একাদশ কনস্ট্যানটাইনকে পরাজিত ও হত্যা করে রাজধানী কনস্ট্যান্টিনোপল দখল করে। কনস্ট্যান্টিনোপলের পতনের ফলে পূর্ব রোমান সাম্রাজ্যের অস্তিত্বের অবসান ঘটে।
(1) চতুর্থ ক্রুসেডের প্রভাব : প্রথম তিনটি ক্রুসেডের সময় সমগ্র পশ্চিমি খ্রিস্টান জগৎ কনস্ট্যান্টিনোপলকে তুর্কিদের হাত থেকে রক্ষা করেছিল। কিন্তু চতুর্থ ক্রুসেডের (১২০২-১২০৪ খ্রিস্টাব্দ) সময় ধর্মীয় আবেগের বদলে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়। ভেনিসের বণিকদের সঙ্গে বাণিজ্যিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল বাইজানটিয়াম সাম্রাজ্যের। খ্রিস্টান ধর্মযোদ্ধাদের হাতেই বাইজানটিয়াম সাম্রাজ্যে রাজধানী কনস্ট্যান্টিনোপল বিধ্বস্ত হয়। এই ধাক্কা পূর্ব রোমান সাম্রাজ্য সামলাতে পারেনি। এটিই ছিল কনস্ট্যান্টিনোপলের পতনের পূর্বাভাষ।
(2) চতুর্দশ শতকের প্লেগ: ইউরোপের চতুর্দশ শতকের ভয়াবহ প্লেগ অন্যান্য অনেক অঞ্চলের ন্যায় কনস্ট্যান্টিনোপলের জনসংখ্যাকে এক ধাক্কায় অনেকটাই কমিয়ে দিয়েছিল। ঐতিহাসিক এডউইন পিয়ার্সের মতে, ১৪৫৩ খ্রিস্টাব্দে তুর্কিদের আক্রমণে শহরের পতনের সময় এর জনসংখ্যা ছিল মাত্র এক লক্ষ। এর মধ্যে তুর্কিদের বিরুদ্ধে সম্রাটের পক্ষে লড়াই করেছিল মাত্র কয়েক হাজার যোদ্ধা। এই দুর্বলতাও পতনের সহায়ক হয়।
(3) অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব : বাইজানটাইন সাম্রাজ্যের অভ্যন্তরীণ কনস্ট্যান্টিনোপলের পতনের অন্যতম কারণ ছিল। সম্রাট ও অভিজাতদের মধ্যে ক্ষমতার লড়াই, আর্থিক সংকট প্রভৃতি সাম্রাজ্যের অবক্ষয়কে ত্বরান্বিত করে। তা ছাড়া ১৩২১ থেকে ১৩৫৪ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে বাইজানটাইন সাম্রাজ্যে দুটি গৃহযুদ্ধ হয়, যা সাম্রাজ্যের ভিত্তিকে দুর্বল করে দিয়েছিল। এই গৃহযুদ্ধ তুর্কি আক্রমণের সম্ভাবনাকেও বাড়িয়ে দিয়েছিল।
(4) গ্রিক ও রোমান চার্চেরদ্বন্দ্ব : পশ্চিমের রোমান ক্যাথোলিক চার্চের সঙ্গে পূর্বের গ্রিক চার্চের সুসম্পর্ক ছিল না। দুই চার্চের মধ্যে নীতিগত বিরোধ ছিল। এই বিরোধের কারণে তুর্কিরা ১৪৫৩ খ্রিস্টাব্দে কনস্ট্যান্টিনোপল আক্রমণ করলে পশ্চিম ইউরোপ থেকে কোনো সাহায্য আসেনি। এ ছাড়া ফ্রান্সসহ পশ্চিম ইউরোপের অনেক দেশ ক্রমশই নানা কারণে কনস্ট্যান্টিনোপলের বিরোধী হয়ে উঠেছিল। তাই তুর্কি আক্রমণকালে এই দেশগুলি সাহায্যের ব্যাপারে উদাসীন ছিল। ক্যাথোলিক রোম ও গ্রিক খ্রিস্টানদের মধ্যে দ্বন্দু বাইজানটাইন সাম্রাজ্যকে দুর্বল করে দিয়েছিল।
(5) অটোমানদের গ্রিক ও বলকান অঞ্চল দখল: চতুর্দশ শতকের প্রথমদিকে অটোমান তুর্কিরা গ্রিসের রুমেনিয়া, এশিয়া-মাইনর দখল করে নিলে পূর্ব রোমান সাম্রাজ্য সংকটের মুখে পড়ে কারণ সাম্রাজ্যের বেশিরভাগ সৈন্যবাহিনী এই অঞ্চল থেকে সংগ্রহ করা হত। এরপর থেকে ভাড়াটে ভাগ্যান্বেষী সৈন্যদের ওপর নির্ভর করতে হয় যা, সামরিক ও আর্থিক উভয় দিক থেকে সাম্রাজ্যের দুর্বলতা ডেকে এনেছিল।
(6) সুলতান দ্বিতীয় মহম্মদের সামরিক প্রতিভা: কনস্ট্যান্টিনোপলের পতনের পিছনে সুলতান দ্বিতীয় মহম্মদের সুদক্ষ নেতৃত্ব, উন্নত সামরিক কৌশল এবং বিশাল সৈন্যদল ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করেছিল। সাত সপ্তাহ অবরোধের পর কনস্ট্যান্টিনোপলের বিশাল দুর্গপ্রাচীরকে শক্তিশালী গোলন্দাজ বাহিনী ধ্বংস করেন এবং কনস্ট্যান্টিনোপল শহর দখল করেন।
মূল্যায়ন
১৪৫৩ খ্রিস্টাব্দ কনস্ট্যান্টিনোপলের পতন ইউরোপ তথা পৃথিবীর ইতিহাসে একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা হিসেবেই চিহ্নিত হয়। এর ফলে অটোমান তুর্কি শক্তি গ্রিসসহ পূর্ব ইউরোপের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে এক সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে। কনস্ট্যান্টিনোপলের পতনের ঘটনাকে অনেকেই ইউরোপের মধ্যযুগের অবসান ও আধুনিক যুগের সূচনার সীমান্তরেখা বলে অভিহিত করেন।
আরও পড়ুন – নুন কবিতার বড় প্রশ্ন উত্তর
খুব সুন্দর তথ্যবহুল বিশ্লেষণ।
ধন্যবাদ।