আদর্শবাদী তত্ত্বের মৌলিক বৈশিষ্ট্যসমূহ আলোচনা করো

আদর্শবাদী তত্ত্বের মৌলিক বৈশিষ্ট্যসমূহ

আদর্শবাদী তত্ত্বের মৌলিক বৈশিষ্ট্যসমূহ আলোচনা করো
আদর্শবাদী তত্ত্বের মৌলিক বৈশিষ্ট্যসমূহ আলোচনা করো

আদর্শবাদী তত্ত্বের মৌলিক বৈশিষ্ট্যসমূহ

সাধারণভাবে আন্তর্জাতিক সম্পর্কে আদর্শবাদী তত্ত্বের নিম্নলিখিত বৈশিষ্ট্যগুলি চিহ্নিত করা যায়-

নৈতিকতার প্রতি গুরুত্ব: আদর্শবাদে রাষ্ট্রগুলির পারস্পরিক সম্পর্ক নির্ধারণের ক্ষেত্রে নৈতিকতা (Morality)-কে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। আদর্শবাদীরা বিশ্বাস করেন, সাধারণ নৈতিক আদর্শ ও মূল্যবোধ বিশ্ব সম্প্রদায়কে ঐক্যবদ্ধ করতে সাহায্য করে। তাঁদের মতে, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে রাষ্ট্রগুলি যদি পারস্পরিক সম্পর্ক স্থাপনে নৈতিকতাকে মেনে চলে তাহলে যুদ্ধ, সহিংসতা, স্বৈরাচার প্রভৃতিকে এড়ানো যেতে পারে।

পারস্পরিক সহযোগিতার প্রতি গুরুত্ব: আদর্শবাদী তত্ত্ব আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে রাষ্ট্রগুলির পারস্পরিক সম্পর্ক স্থাপনে জাতীয় স্বার্থের বদলে পারস্পরিক সহযোগিতাকে বেশি গুরুত্ব দিতে চেয়েছে। আদর্শবাদ অনুসারে রাষ্ট্রগুলির মধ্যে ক্ষমতার রেষারেষি থাকলে চলবে না বরং একটি যুদ্ধমুক্ত শান্তিপূর্ণ আদর্শ বিশ্বব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে সবার আগে রাষ্ট্রগুলির মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা স্থাপন করতে হবে।

আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা: আদর্শবাদের তাত্ত্বিকগণের মতে, যুদ্ধের পরিস্থিতিকে নির্মূল করতে আন্তর্জাতিক সমাজকে যথাযথ আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান স্থাপন করতে হবে। এই তত্ত্বের প্রধান প্রবক্তা মার্কিন রাষ্ট্রপতি উড্রো উইলসন বিশ্বশান্তি, সমৃদ্ধি ও উন্নয়ন নিশ্চিত করার জন্য আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার উপরে জোর দেন। তাঁর মতে, আন্তর্জাতিক আইন ও আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সক্রিয় উপস্থিতি থাকা দরকার। তিনি মনে করতেন, আন্তর্জাতিক স্তরে একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান স্থাপন করলে আন্তঃরাষ্ট্র সুসম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে নৈরাজ্যমূলক অবস্থার অবসান ঘটানো সম্ভব।

এই উদ্দেশ্যে রাষ্ট্রপতি উইলসন প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরে অশান্ত পৃথিবীতে শান্তি ফেরানোর জন্য মিত্র শক্তির (ব্রিটেন, আমেরিকা, ফ্রান্স, রাশিয়া) উদ্যোগে বিশ্বের প্রধান রাষ্ট্রগুলিকে নিয়ে ‘লিগ অফ নেশনস্’-এর প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ১৯২০ খ্রিস্টাব্দের ১০ জানুয়ারি প্যারিস শান্তি সম্মেলনের মাধ্যমে ‘লিগ অফ নেশনস্’-এর উদ্ভব ঘটে। এটি ছিল প্রথম আন্তর্জাতিক সংস্থা যা বিশ্বশান্তি বজায় রাখার উদ্দেশ্যে গঠিত হয়েছিল। আদর্শবাদী তাত্ত্বিকদের অভিমত অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক শান্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সংগঠন ও আন্তর্জাতিক আইনের ইতিবাচক ভূমিকা আছে।

কূটনীতি ও আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে বিরোধ মীমাংসা : আদর্শবাদ আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে রাষ্ট্রগুলির মধ্যে দ্বন্দ্ব-বিরোধ মীমাংসার ব্যাপারে শান্তিপূর্ণ পদ্ধতিতে কূটনৈতিক আলাপ-আলোচনাকে অগ্রাধিকার দেয়। কোনোরকম সহিংসতা, ক্ষমতা প্রদর্শন বা সশস্ত্র আক্রমণের মাধ্যমে বিরোধ মীমাংসাকে আদর্শবাদ অনুমোদন করে না। বলা যায় আদর্শবাদ কখনোই ক্ষমতার রাজনীতিকে সমর্থন করে না। অর্থাৎ আদর্শবাদীরা শান্তিপূর্ণভাবে বিবাদ মীমাংসার মাধ্যমে যুদ্ধকে নির্মূল করে স্থায়ী শান্তির পরিবেশ গড়ে তুলতে চায়।

রাষ্ট্রীয় কারকের প্রাধান্য: আদর্শবাদী দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারে, ‘রাষ্ট্র’ হল বিশ্বব্যবস্থার প্রধান কারক (Actor) বা ক্রিয়াকারী। কারণ রাষ্ট্রই আন্তর্জাতিক রাজনীতি পরিচালনার প্রধান চালিকাশক্তি। রাষ্ট্রকে কেন্দ্র করেই আন্তর্জাতিক সম্পর্ক পরিচালিত হয়। এজন্য রাষ্ট্রগুলিই যুদ্ধকে এড়িয়ে স্থায়ী বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে।

ইতিবাচক মানবচরিত্র: আদর্শবাদীরা ইতিবাচক দিক থেকে মানবচরিত্রকে ব্যাখ্যা করেছিলেন। তাঁদের মতে, মানবপ্রকৃতি মূলত ভালো ও সহযোগিতার মনোভাবসম্পন্ন। মানবচরিত্র আত্মকেন্দ্রিক নয় বরং স্বার্থহীন। হিংসা, ক্ষমতালিপ্সা মানুষের প্রবৃত্তিগত বৈশিষ্ট্য নয়। তাই স্বাভাবিকভাবেই তারা অন্যের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে পারে। এই সহযোগিতার মানসিকতাই মানবসভ্যতা উন্নয়নের মূল উৎস।

খারাপ প্রতিষ্ঠান বা সামাজিক কাঠামোর নেতিবাচক ভূমিকা: আদর্শবাদী তত্ত্ব অনুসারে মানুষের খারাপ আচরণের জন্য দায়ী হল খারাপ প্রতিষ্ঠান বা সামাজিক কাঠামো। আদর্শবাদীরা মনে করেন, এধরনের প্রতিষ্ঠান মানুষকে স্বার্থান্বেষী কাজ করতে বাধ্য করে। শুধু তাই নয়, অনিষ্টকারী প্রতিষ্ঠানের নেতিবাচক প্রভাবের ফলেই যুদ্ধ, আগ্রাসন ও সাম্রাজ্যবাদ বিস্তারের মতো ঘটনা লক্ষ করা যায়। এজন্য সবার আগে এধরনের প্রতিষ্ঠান বা সামাজিক কাঠামোর সংস্কার করা প্রয়োজন এবং ইতিবাচক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান স্থাপন করা আবশ্যক।

যুদ্ধ মানবসমাজের অপরিহার্য অঙ্গ নয়: আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার সবচেয়ে ভয়াবহ ও খারাপ দিক হল যুদ্ধ। আদর্শবাদের প্রবক্তাদের মতে, যুদ্ধ কখনই মানবসমাজের অপরিহার্য অঙ্গ হতে পারে না। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে যখন নৈরাজ্য দেখা দেয় একমাত্র তখনই যুদ্ধের আশঙ্কা তৈরি হয়। অর্থাৎ ত্রুটিপূর্ণ আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি বা ব্যবস্থা যুদ্ধের অবস্থা সৃষ্টি করে। এই নৈরাজ্য দূর করতে হলে আন্তর্জাতিক স্তরে রাষ্ট্রগুলিকে একসঙ্গে যৌথ প্রচেষ্টা নিয়ে এগিয়ে আসতে হয়। অর্থাৎ বহুপাক্ষিক স্তরে অবিচার দূর করতে পারলে যুদ্ধ এড়ানো সম্ভব। শুধুমাত্র জাতীয় স্তরে এই সমস্যার সমাধান কখনোই সম্ভব নয়।

গণতন্ত্রের প্রতি আস্থা: আদর্শবাদ বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধগুলির প্রতি আস্থা রেখেছে। কারণ, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ যুদ্ধ পরিহার করে যৌথ স্বার্থপূরণে অধিক গুরুত্ব আরোপ করে। এপ্রসঙ্গে উড্রো উইলসনের মত উল্লেখ্য। তাঁর মতে শান্তি ও গণতন্ত্রে বিশ্বাসী জনগণ যুদ্ধ চায় না। তিনি যুদ্ধকে গণতন্ত্রের প্রধান শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। যাইহোক আদর্শবাদীদের অভিমত হল, একই মূল্যবোধে রাষ্ট্রগুলি বিশ্বাসী হলে সংঘাত বাধার সম্ভাবনাও অনেকাংশে হ্রাস পায়। ফলে গণতন্ত্রের প্রতি তাঁরা প্রবল আস্থা প্রকাশ করেন।

প্রকাশ্য কূটনীতির প্রচার: উইলসন গোপন কূটনীতিকে বিশ্বশান্তির পরিপন্থী বলে মনে করতেন। তাঁর মতে গোপন কূটনীতি বিভিন্ন রাষ্ট্রের মধ্যে সন্দেহ ও তিক্ততার পরিবেশ তৈরি করে। তাই তিনি প্রকাশ্য কূটনীতির প্রসারে গুরুত্ব দিয়েছিলেন। আদর্শবাদীদের মতে, মুক্ত পরিবেশে পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সমস্যার শান্তিপূর্ণ মীমাংসা করা সম্ভব। প্রকাশ্য কূটনীতির পাশাপাশি তাঁরা মুক্ত বাণিজ্য নীতি-র (Laissez-faire) বিস্তারেও গুরুত্ব আরোপ করেছিলেন। কারণ তাঁরা মনে করেছিলেন মুক্ত বাণিজ্যনীতি প্রসারিত হলে রাষ্ট্রগুলির মধ্যে পারস্পরিক নির্ভরশীলতা বৃদ্ধি পাবে যা যুদ্ধের সম্ভাবনাকে হ্রাস করবে।

আদর্শবাদী তত্ত্বের সমালোচনা

উড্রো উইলসনের চোদ্দো দফা নীতি, ভার্সাই সন্ধি, লিগ অফ নেশনস্ বা জাতিসংঘ গঠনের মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক স্তরে আদর্শবাদের বাস্তব প্রয়োগ লক্ষ করা যায়। যদিও ভার্সাই সন্ধির ত্রুটির মধ্যেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বীজ নিহিত ছিল, যা পরবর্তীকালে আদর্শবাদী ভাবনাকে অপ্রাসঙ্গিক করে তোলে। যাইহোক ১৯৩০-এর দশক থেকে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে জাতীয় স্বার্থের প্রাধান্য, ইউরোপে ফ্যাসিবাদ ও নাৎসিবাদের উত্থান, ক্ষমতার রাজনীতির আধিপত্য, অর্থনৈতিক মন্দা, স্থায়ী শান্তির সম্ভাবনা সম্পর্কে সংশয় প্রভৃতি আন্তর্জাতিক সম্পর্কের চর্চায় আদর্শবাদের অকার্যকারিতা ও দুর্বলতাকে স্পষ্ট করে তোলে। আদর্শবাদের বিরুদ্ধে সমালোচনাগুলি হল-

আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ক্ষমতার রাজনীতিকে উপেক্ষা : আদর্শবাদে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশ্লেষণে ক্ষমতার রাজনীতিকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা হয়েছে। সমালোচকদের মতে, ক্ষমতার রাজনীতিকে বাদ দিয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশ্লেষণ কখনোই বাস্তবসম্মত হতে পারে না। কারণ বাস্তবে রাষ্ট্রগুলি ক্ষমতার রাজনীতিকে মাথায় রেখে অন্য রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করে। আন্তর্জাতিক স্তরে ক্ষমতার রাজনীতিই রাষ্ট্রগুলিকে চালিত করে। কোনো নীতিবোধ বা আদর্শকে সামনে রেখে রাষ্ট্রগুলি চালিত হয় না।

মানবিক গুণাবলির উপরে অত্যধিক গুরুত্ব আরোপ : আদর্শবাদী তত্ত্বে যেভাবে আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে বিশ্লেষণ করা হয় সেখানে আগে থেকেই ধরে নেওয়া হয় যে রাষ্ট্রগুলি মানবিক গুণাবলির দ্বারা পরিচালিত হবে। নৈতিকতাকে মাথায় রেখে তারা। অন্য রাষ্ট্রের দিকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেবে। এভাবে আদর্শবাদে মানবিক গুণাবলিকে গুরুত্ব দিয়ে এক উচ্চাকাঙ্ক্ষী আদর্শবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে। অথচ বাস্তবে এসব আবেগের কোনো মূল্য আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে দেখা যায় না।

জাতীয় স্বার্থ উপেক্ষিত: আদর্শবাদ আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশ্লেষণে জাতীয় স্বার্থকে কোনো গুরুত্ব না দিয়ে তাকে সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করেছে। অথচ বাস্তবে নিজেদের জাতীয় স্বার্থ ছাড়া রাষ্ট্রগুলি একটি পদক্ষেপও গ্রহণ করে না। প্রতিটি রাষ্ট্র ভালো করে বিচারবিবেচনা ও খুঁটিনাটি পর্যালোচনা করার পরই অন্য রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন বা চুক্তির বন্ধনে আবদ্ধ হয়। বর্তমানে কৌশলগত দিক থেকেই আন্তর্জাতিক রাজনীতি পরিচালিত হয়।

অবাস্তবতা: আদর্শবাদী তত্ত্বের ভাবনা এবং ধারণাগুলির সঙ্গে বাস্তবের কোনো সম্পর্ক নেই। এজন্য সমালোচকরা আদর্শবাদকে একটি ইউটোপীয়ান তথা কাল্পনিক বা অবাস্তব মতবাদ (Unrealistic Theory) বলে অভিহিত করেছেন। তাঁদের মতে, আদর্শবাদ যেভাবে একটি সংঘর্ষমুক্ত ও সহযোগিতার আদর্শে উজ্জীবিত বিশ্বের ছবি তুলে ধরেছে তা বাস্তবের সঙ্গে কোনোভাবেই সংগতিপূর্ণ নয়।

জাতীয় সার্বভৌমত্ব উপেক্ষিত: সমালোচকরা মনে করেন, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশ্লেষণে আদর্শবাদী তত্ত্ব রাষ্ট্রগুলির জাতীয় সার্বভৌমত্বের বিষয়টিকে কোনো গুরুত্বই দেয়নি। আদর্শবাদ আধুনিক রাষ্ট্রের এই প্রধান উপাদানটিকে সম্পূর্ণ এড়িয়ে গেছে। অথচ বাস্তবে দেখা যায়, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে কোনো রাষ্ট্রই নিজেদের জাতীয় নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থকে বিসর্জন দিয়ে অন্য রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের কথা ভাবতে পারে না।

নিরাপত্তা রক্ষায় ভ্রান্ত ধারণা: আদর্শবাদ যৌথ নিরাপত্তা (Collective Security) ব্যবস্থার মাধ্যমে যুদ্ধের অবসান ঘটাতে ও শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছে, যা ভ্রান্ত। কারণ যৌথ নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থায় শক্তিশালী রাষ্ট্রের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হয়। তাই বাস্তববাদীগণ শান্তিরক্ষায় শক্তির ভারসাম্য (Balance of Power)-এর উপর গুরুত্ব আরোপ করেন।

মানবপ্রকৃতি সম্পর্কে ভ্রান্ত ধারণা: আদর্শবাদীগণ মানবপ্রকৃতি সম্পর্কে উচ্চ নৈতিক ধারণা পোষণ করতেন। কিন্তু মানুষ মূলত ক্ষমতাপ্রিয়, যা ম্যাকিয়াভেলি, হক্স এমনকি ভারতে কৌটিল্যের ভাবনাতেও প্রতিফলিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক সমাজে নৈরাজ্যের প্রেক্ষাপটেও এই বিষয়টি স্পষ্ট। ফলে মানুষ নৈতিক ও সহযোগিতার মানসিকতাসম্পন্ন একথা সঠিক নয়।

বাস্তববাদীদের সমালোচনা: বাস্তববাদী তাত্ত্বিক ই এইচ কার তার ‘টোয়েন্টি ইয়ারস ক্রাইসিস’ (Twenty Years Crisis) গ্রন্থে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক আলোচনার আদর্শনির্ভর ব্যাখ্যার কঠোর সমালোচনা করে বলেছেন, আদর্শবাদ আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে জাতীয় শক্তি ও জাতীয় স্বার্থের মতো বিষয়ের গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন নয়। পরিবর্তে স্থায়ী শাস্তি, সহযোগিতা, নৈতিকতা ও সদিচ্ছার উপর গুরুত্ব দিয়েছে, যা বাস্তবসম্মত নয়। এমনকি আদর্শবাদীগণ সকল রাষ্ট্রের জন্য যে সর্বজনীন নৈতিক মানের কথা উল্লেখ করেছেন, বাস্তবে রাষ্ট্রের ভূমিকা তেমন সর্বজনীন নৈতিকতার সাহায্যে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। বরং সমালোচকরা মনে করেন, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশ্লেষণে কোনো ভাবাবেগ, নৈতিকতা বা আদর্শগত মূল্যবোধের স্থান নেই। একে সঠিকভাবে বিশ্লেষণ করতে গেলে তা বাস্তবসম্মত দৃষ্টিকোণ থেকেই করতে হবে।

ঐতিহাসিক বিচ্যুতি: আন্তর্জাতিক সম্পর্কের আদর্শবাদী তত্ত্বের কড়া সমালোচনা করে অনেকে বলেন, এই তত্ত্বকে সামনে রেখে তৈরি হওয়া ‘লিগ অফ নেশনস্’ যেভাবে কয়েক বছরের মধ্যে ভেঙে পড়ে এবং যেভাবে বিধ্বংসী দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ প্রতিরোধ করতে এই তত্ত্ব সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয় তাতে এর ঐতিহাসিক বিচ্যুতি প্রমাণিত হয়েছে।

উপসংহার: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও তার পরবর্তীকালে আন্তর্জাতিক রাজনীতির আলোচনায় আদর্শবাদী দৃষ্টিভঙ্গির গুরুত্ব হ্রাস পেতে থাকে ও ক্ষমতাকেন্দ্রিক বাস্তববাদী দৃষ্টিকোণ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এতদসত্ত্বেও স্বীকার করতে হয়, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের আলোচনায় আদর্শবাদী তত্ত্ব আজকের দিনেও সম্পূর্ণ অচল নয়। এই তত্ত্বেরও ভালো দিক রয়েছে। আদর্শবাদী দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে লুকিয়ে আছে এক নতুন বিশ্বের স্বপ্ন। আদর্শবাদীরা আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে চিরস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে চায় এজন্য তাঁরা যুদ্ধে ব্যবহৃত মারণাস্ত্র ধ্বংসের পাশাপাশি সেগুলির নিরস্ত্রীকরণের কথাও বলেন, রাষ্ট্রগুলির মধ্যে দ্বন্দ্ব-বিবাদ মীমাংসার জন্য উপযুক্ত আন্তর্জাতিক আইন প্রবর্তনের কথা বলেন।

শুধু তাই নয়, তাঁরা আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে নৈতিকতা ও দায়িত্বশীলতার উপর ভিত্তি করে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। এপ্রসঙ্গে উল্লেখ্য যে, ১৯৩০-এর দশক থেকে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক চর্চার প্রধান লক্ষ্যই ছিল যুদ্ধের অন্তর্নিহিত কারণগুলি অনুসন্ধান করে বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার অনুকূলে প্রয়োজনীয় তত্ত্ব নির্মাণ করা এবং প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রগুলিকে নিয়ে একটি সহযোগিতামূলক ব্যবস্থা গড়ে তোলা। সেই প্রেক্ষিতে বলা যায়, আন্তর্জাতিক সম্পর্কে আদর্শবাদী তত্ত্ব বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার অঙ্গ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে এবং পরবর্তীকালে ১৯৬০-এর দশক থেকে আদর্শবাদী বিশ্লেষণ ধারা উদারবাদের কাঠামোয় নতুনরূপে আবির্ভূত হয়েছে।

আরো পড়ুন : উচ্চমাধ্যমিক চতুর্থ সেমিস্টার দর্শন প্রশ্ন উত্তর

Leave a Comment