বিশ্বায়নের কারণগুলি লেখো

বিশ্বায়ন হল এমন একটি প্রক্রিয়া যেখানে অর্থনৈতিক, সামাজিক রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক দিক থেকে বিভিন্ন দেশ ও সংস্কৃতি একে অপরের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হয়। এটি প্রযুক্তির উন্নতি, পরিবহন ব্যবস্থার অগ্রগতি এবং তথ্যের দ্রুত প্রবাহের মাধ্যমে সম্ভব হয়েছে। বিশ্বায়নের কারণে বিশ্বের বেশিরভাগ রাষ্ট্রেই বর্তমানে উদারীকরণের ঢল নেমেছে। ফলে কোনো রাষ্ট্রই বিশ্বায়ন প্রক্রিয়া থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন রাখতে পারছে না। বর্তমানে বিশ্বায়ন হল একটি বিশ্বব্যাপী বহমান প্রক্রিয়া। নিম্নে বিশ্বায়নের কারণগুলি সম্পর্কে আলোচনা করা হল।
বিশ্বব্যাপী পুঁজিবাদী মতাদর্শের আবির্ভাব :
বিশ্বায়নের আবির্ভাবের একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হল-সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন। সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের পতনের পর বিশ্বে দ্বিমেরুর স্থান দখল করল একমেরু এবং বিশ্বব্যাপী একটিমাত্র মতাদর্শ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল, সেটি হল পুঁজিবাদী দুনিয়ার মদতে গড়ে ওঠা নয়া উদারনীতিবাদ। বিশ্ববাসী উপলব্ধি করতে পেরেছে যে, পুঁজিবাদী – দুনিয়ার নেতৃত্বে পরিচালিত বিশ্বায়নের প্রভাব থেকে নিজেদেরকে – সরিয়ে রাখা যাবে না। এই কারণেই বিশ্বায়নের ফলস্বরূপ মূলধনের সচলতা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং উৎপাদিত দ্রব্যসমূহ বিশ্ব বাজারে উপস্থিত ও বিক্রয় করা সহজ হয়েছে।
রাষ্ট্রগুলির পরিবর্তে সংস্থাগুলির সদর্থক ভূমিকা:
বিশ্বায়নের আবির্ভাবের অন্যতম একটি কারণ হল, রাষ্ট্রনেতা, রাজনীতিবিদ ও প্রশাসকগণের দৃষ্টিভঙ্গি ও চিন্তাধারার পরিবর্তন। এঁরা মনে করেন, উন্নয়নে রাষ্ট্রের ভূমিকা ক্রমাগত ক্ষীণ হয়ে আসছে, তার পরিবর্তে আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিল (IMF) এবং আন্তর্জাতিক পুনর্গঠন ও উন্নয়ন ব্যাংক (IBRD) প্রভৃতি সংস্থাগুলি বিশ্বের অর্থব্যবস্থার পুনরুজ্জীবন ও পুনর্গঠনের জন্য সদর্থক ভূমিকা পালন করেছে।
প্রযুক্তির উন্নতি:
বিংশ শতকের ৮০-এর দশক ও তার পরবর্তীকালে বিজ্ঞান, প্রযুক্তিবিদ্যা, কারিগরি কৌশল ইত্যাদি ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব বিপ্লব এসেছিল। মূলধন ও প্রযুক্তিগত কৌশলের আদানপ্রদান আজ বিশ্বজনীন হয়েছে। মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট, ই-মেল ইত্যাদির মতো যোগাযোগ প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতির ফলে বিশ্বব্যাপী জনগণের মধ্যে সহজে যোগাযোগ স্থাপিত হয়েছে। ফলে শিল্পসমৃদ্ধ দেশগুলির পক্ষে পুঁজি ও কারিগরি কৌশলকে ব্যবহার করে বিভিন্ন দেশে বাণিজ্য ও লোক নিয়োগ করা সহজ হয়েছে।
রাজনৈতিক সম্পর্ক ও আন্তর্জাতিক চুক্তি:
বিশ্বায়নের আবির্ভাবের অপর একটি কারণ হল বিশ্বের রাষ্ট্রনেতা, প্রশাসক ও রাজনীতিবিদদের মধ্যে আলোচনাসভা আয়োজন ও আন্তর্জাতিক চুক্তি স্থাপন। যার ফলে বহুদেশ একে অপরের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি, অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও সাংস্কৃতিক বিনিময় ঘটাচ্ছে যা বিশ্বায়নের গতিকে আরও দ্রুততর করেছে।
উন্নত রাষ্ট্রগুলি থেকে উপাদান সংগ্রহ:
উপনিবেশবাদ পরবর্তী যুগে বিশ্বের সকল উন্নয়নশীল দেশের অন্যতম লক্ষ্য হল দ্রুত বিকাশের ব্যবস্থা করা। ফলস্বরূপ তারা উন্নত রাষ্ট্রগুলি থেকে উন্নয়ন ও বিকাশের স্বার্থে নানা উপাদান সংগ্রহে সচেষ্ট হয়। এই মানসিকতা থেকেই বিশ্বায়নের জন্ম হয়।
অর্থনৈতিক উন্নয়ন:
বিশ্বায়নের আবির্ভাবের গুরুত্বপূর্ণ কারণ হল অর্থনৈতিক উন্নতির বিকাশ। বিশ্বায়নের ফলে রাষ্ট্র আরোপিত বিভিন্ন শুল্কগত ও অশুল্কগত বাধানিষেধ শিথিল হয়েছে। একারণে বিশ্ববাজারে পণ্য ও পরিসেবামূলক আদানপ্রদান বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে বহুজাতিক কোম্পানিগুলি আন্তর্জাতিক স্তরে ব্যাবসা করছে। এর ফলে সারা বিশ্বে অর্থনৈতিক বিশ্বায়ন দ্রুত প্রসারিত হচ্ছে।
পরিবহন প্রযুক্তির অগ্রগতি:
বর্তমানে বিশ্বে বিশ্বায়ন গড়ে ওঠার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কারণ হল পরিবহন প্রযুক্তির অগ্রগতি। বিমান, রেল এবং শিপিংয়ের উন্নতির মাধ্যমে দ্রুত ও সস্তায় পণ্য পরিবহন সম্ভব হয়েছে, যা বিশ্ব বাণিজ্যকে আরও বেশি সহজতর করে তুলেছে এবং সমগ্র বিশ্বের অবাধ আদানপ্রদান ও মূলধন চলাচল প্রক্রিয়ার প্রতিযোগিতাকে তীব্র করে তুলেছে।
সাংস্কৃতিক আদানপ্রদান:
বর্তমানে প্রতিটি রাষ্ট্র তার সংস্কৃতি চর্চার নিজস্বতা দাবি করতে পারে না। এক্ষেত্রে একটি সমসত্ত্বতা পরিলক্ষিত হতে দেখা গেছে। এক দেশের সংস্কৃতি অন্য দেশে খুব সহজেই প্রসারিত হচ্ছে। বিশেষত নাচ, গান, চলচ্চিত্র, খবর, ফ্যাশন, বিজ্ঞাপন ইত্যাদির মাধ্যমে এক দেশের সংস্কৃতি অন্য দেশে ছড়িয়ে পড়ছে, ফলে সংস্কৃতিচর্চার ক্ষেত্রে কোনো রাষ্ট্র আজ নিজস্বতা দাবি করতে পারে না। এক্ষেত্রে বিশ্বব্যাপী সংস্কৃতিচর্চার একটি অভিন্ন পরিবেশ তৈরি হয়েছে। ফলে বলা যায় সংস্কৃতির আদানপ্রদান বিশ্বায়নের আবির্ভাবের অন্যতম একটি কারণ।
উপরোক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে বলা যায় বিশ্বব্যাপী মানসিকতার পরিবর্তন বিশ্বায়নের গুরুত্ব বৃদ্ধি করেছে। পাশাপাশি বিশ্বায়ন মানুষের জীবনযাত্রায় পরিবর্তন ঘটিয়েছে। এটি সুযোগ সৃষ্টির পাশাপাশি কিছু চ্যালেঞ্জও নিয়ে এসেছে। যেমন সারা পৃথিবী জুড়ে অর্থনৈতিক বৈষম্য বৃদ্ধি এবং সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের ক্ষতি করেছে। অধ্যাপক জয়ন্তানুজ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতে, “বিশ্বায়নের ইতিবাচক ও নেতিবাচক উভয় ধরনের বৈশিষ্ট্য লক্ষ করা যায়। প্রযুক্তিগত দিক থেকে বিশ্বায়ন দূরকে। নিকট, আর পরকে করেছে আপন। শিল্পোৎপাদনের সময়কে হ্রাস করেছে বহুগুণ।”
আরো পড়ুন : রাষ্ট্রের প্রকৃতি – একাদশ শ্রেণির ইতিহাস প্রথম অধ্যায় প্রশ্ন উত্তর