রাষ্ট্রের প্রকৃতি – একাদশ শ্রেণির ইতিহাস প্রথম অধ্যায় প্রশ্ন উত্তর | Class 11 Second Semester History 1st Chapter Question Answer

বোর্ড : বিষয়বস্তু

রাষ্ট্রের প্রকৃতি – একাদশ শ্রেণির ইতিহাস প্রথম অধ্যায় প্রশ্ন উত্তর | Class 11 Second Semester History 1st Chapter Question Answer

রাষ্ট্রের প্রকৃতি - একাদশ শ্রেণির ইতিহাস প্রথম অধ্যায় প্রশ্ন উত্তর
রাষ্ট্রের প্রকৃতি – একাদশ শ্রেণির ইতিহাস প্রথম অধ্যায় প্রশ্ন উত্তর

১। কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে রাজতন্ত্র ও রাষ্ট্রনীতি সম্পর্কে ধারণা কী ছিল
অথবা, রাষ্ট্রের প্রকৃতি সম্পর্কে কৌটিল্যের বক্তব্য সংক্ষেপে লেখো

 

কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে প্রাচীন ভারতের রাজতন্ত্র ও রাষ্ট্রনীতি সম্বন্ধে বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যায়।

কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে রাজতন্ত্র সম্পর্কিত ধারণা

(i) রাজার নিরঙ্কুশ ক্ষমতা

কৌটিল্য তাঁর অর্থশাস্ত্রে রাজাকে রাজতন্ত্রের প্রতীকরূপে বর্ণনা করেছেন। তাঁর মতে, রাষ্ট্রের মধ্যে রাজা হলেন সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী। রাজার নির্দেশ কেউ অমান্য করতে পারবে না। কৌটিল্য মনে করতেন যে, প্রজাদের মঙ্গলসাধনের জন্য যেমন রাজার হাতে ক্ষমতা থাকা প্রয়োজন, ঠিক তেমনই কোনও কারণে রাজার বিরুদ্ধে জনগণ বিদ্রোহের পথে পা বাড়ালে, তা দমনের জন্যও রাজার হাতে ক্ষমতা থাকা একান্ত প্রয়োজন।

(ii) রাজার ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ

অর্থশাস্ত্রে বলা হয়েছে যে, ব্যক্তিগত স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য রাজা কখনোই শাসনব্যবস্থাকে ব্যবহার করতে পারবেন না। এ ছাড়া রাজার ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ ও সুষ্ঠুভাবে যাবতীয় কর্তব্যপালনের উদ্দেশ্যে কৌটিল্য রাজাকে মন্ত্রীপরিষদের পরামর্শ নিয়ে প্রশাসন পরিচালনার কথা বলেছেন। কৌটিল্যের মতানুযায়ী, রাজার স্বৈরাচারী হওয়ার সুযোগ সীমাবদ্ধ ছিল।

(iii) বংশানুক্রমিক রাজতন্ত্র

কৌটিল্য ছিলেন বংশানুক্রমিক ও উচ্চবংশজাত রাজতন্ত্রের সমর্থক। তাঁর মতে, উচ্চবংশজাত কোনও রাজা যদি বংশানুক্রমিকভাবে রাজ্য শাসন করেন, তাহলে রাজার প্রতি প্রজাদের আনুগত্য বজায় থাকবে। কৌটিল্য মনে করতেন, ক্ষমতাশালী উচ্চ রাজবংশের রাজা শারীরিকভাবে যথেষ্ট সক্ষম না হলেও রাজতন্ত্রের প্রতিষ্ঠিত ঐতিহ্যের অনুগামী হন। তাই তিনি প্রজাদের স্বাভাবিক আনুগত্য অর্জন করেন।

(iv) রাজার দায়িত্ব ও কর্তব্য

রাজতন্ত্রের অপর গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, প্রজাদের প্রতি রাজার দায়িত্বপালন। বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে দেশরক্ষা, জনসাধারণের জীবন ও সম্পত্তিরক্ষা প্রভৃতি হল রাজার অবশ্যপালনীয় কর্তব্য।

কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে রাষ্ট্রনীতি সম্পর্কিত ধারণা

কৌটিল্য ও রচিত অর্থশাস্ত্রে রাষ্ট্রকে সবচেয়ে বড়ো ব্যবসায়ী এবং একচেটিয়া অধিকারভোগী বলে উল্লেখ করা হয়েছে। রাষ্ট্রনীতি সম্পর্কে যে বিষয়গুলির ব্যাখ্যা অর্থশাস্ত্রে করা হয়েছে, সেগুলি হল-

(i) সপ্তাঙ্গ তত্ত্ব

রাষ্ট্রনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হিসেবে অর্থশাস্ত্রে সপ্তাঙ্গ তত্ত্ব-এর উল্লেখ পাওয়া যায়। কৌটিল্য রাষ্ট্রকে জীবদেহের সঙ্গে তুলনা করে এর সাতটি অঙ্গের উল্লেখ করেছেন, যথা- স্বামী, অমাত্য, জনপদ, দুর্গ, কোশ, দণ্ড ও মিত্র।

(ii) রাষ্ট্রের আয়তন

একটি আদর্শ রাষ্ট্রের আকার-আয়তন কেমন হওয়া উচিত সে প্রসঙ্গে কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র থেকে সঠিকভাবে বোঝা না গেলেও অনেকেই বলেন যে, কৌটিল্য বৃহদায়তন রাষ্ট্রের পক্ষপাতী ছিলেন। কারণ, রাষ্ট্র বৃহৎ হলে অনেক বেশি পরিমাণ রাজস্ব আদায় সম্ভব হবে ও এর দ্বারা শক্তিশালী রাজকোশ এবং দক্ষ প্রশাসন গড়ে তোলা যাবে। তবে বিরুদ্ধবাদীদের মতে, কৌটিল্য সুশাসিত, সুশৃঙ্খল এবং জনকল্যাণকামী রাষ্ট্রের কথা বলেছেন। রাষ্ট্রের আকার যদি বড়ো হয় তাহলে এইসব সুবিধা পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে না। এঁদের মতে, সম্ভবত মাঝারি আকারের রাষ্ট্রের উপর কৌটিল্য প্রাধান্য দিয়েছেন।

(iii) ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র

কৌটিল্য রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষ আদর্শের উপর জোর দিয়েছেন। তাঁর মতে, রাষ্ট্রনীতির মূলকথা হবে রাষ্ট্রের প্রয়োজন। কোনও বিশেষ ধর্মভাবনা বা ধর্মগুরুদের দ্বারা রাজা চালিত হবেন না। এই আদর্শ কার্যকর করার জন্য তিনি কিছু পরামর্শও দিয়েছেন। যথা- (a) কোনও বিশেষ ক্ষেত্রে ধর্মশাস্ত্র ব্যাখ্যার জন্য রাজা পুরোহিতের পরামর্শ শুনবেন। কিন্তু রাষ্ট্রের বৃহত্তর স্বার্থের কথা মাথায় রেখে সিদ্ধান্ত নেবেন রাজা স্বয়ং। (b) রাষ্ট্র পুরোহিততান্ত্রিক (Theocratic) হবে না। পুরোহিত বা ধর্মগুরু অপরাধী হলে সাধারণের মতোই চরম শাস্তি পাবেন। (c) রাজকর্মচারীরা ধর্মগুরু বা পুরোহিতের অনুগত হবেন না। কর্মচারীদের আনুগত্য থাকবে কেবল রাজার প্রতি। সাধারণ প্রশাসন ও বিচার বিভাগ- উভয়ক্ষেত্রেই এই ধর্মনিরপেক্ষ আদর্শ পালন করতে হবে।

(iv) জনকল্যাণকামী রাষ্ট্র

জনকল্যাণকর রাষ্ট্রের ধারণা সৃষ্টির ব্যাপারে কৌটিল্যের ভূমিকা সবিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কৌটিল্য তাঁর অর্থশাস্ত্রে জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থার কথা বলতে গিয়ে প্রজাবর্গের কল্যাণসাধন, সমাজসেবামূলক কাজকর্মের উপর বিশেষভাবে জোর দিয়েছেন। অনেকেই কৌটিল্যের এই জনকল্যাণকামী রাষ্ট্রের ধারণাকে যোগক্ষেম নামে অভিহিত করেছেন। এই ধারণা (যোগক্ষেম) অনুযায়ী জনসাধারণের কল্যাণসাধন করাই হল রাষ্ট্রের মৌলিক কাজ। কৌটিল্যের জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্রের দুটি দায়িত্ব হল- সামাজিক নিরাপত্তামূলক কাজ অর্থাৎ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, দুর্ভিক্ষ-মহামারির সময়ে দুর্গতদের সাহায্য করা এবং জনসেবামূলক কাজকর্ম, যেমন- অসাধু ব্যক্তিদের শাস্তিপ্রদান, বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রকল্প বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে সমাজের কল্যাণ করা।

(v) পররাষ্ট্রনীতি বা বিদেশনীতি

পররাষ্ট্রনীতি সম্পর্কে কৌটিল্যের একটি দৃষ্টান্তমূলক পরামর্শ হল ‘রাজমণ্ডল তত্ত্ব’। ‘রাজমণ্ডল’ হল ১২ জন রাজার একটি চক্রাকার অবস্থান। এই বারোজন হলেন- বিজিগীষু রাজা স্বয়ং, তাঁর সম্মুখভাগে ৫ জন রাজা, তাঁর পশ্চাদ্ভাগে ৪ জন রাজা এবং মধ্যম ও উদাসীন রাজা। এই রাজমণ্ডলের কেন্দ্রে বিজিগীষু রাজার অবস্থান। তাঁর কাজ হল, সতর্কতা ও বিচক্ষণতার সঙ্গে অবশিষ্ট রাজন্যবর্গের সঙ্গে সম্পর্ক বিশ্লেষণ করা এবং সেই অনুযায়ী আচরণ করা।

(vi) রাজার গুণাবলি

রাষ্ট্রের রক্ষক হলেন রাজা। তাঁকে হতে হবে সংযমী, দায়িত্ববান, প্রখর স্মৃতিশক্তিসম্পন্ন, কঠোর পরিশ্রমী। কৌটিল্য বলেছেন, রাজা হবেন দূরদর্শী কূটনীতিপরায়ণ। তাঁর মতে, তিনিই হবেন রাষ্ট্রের একমাত্র সর্বময় কর্তৃত্বের অধিকারী। তাঁর নির্দেশেই রাষ্ট্রের যাবতীয় কাজকর্ম সুচারুরূপে পরিচালিত হবে।

(vii) মন্ত্রীপরিষদ

কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে রাষ্ট্রনীতি সম্পর্কিত আলোচনায় রাষ্ট্রের প্রশাসনিক ব্যবস্থা সঠিকভাবে চালানোর জন্য মন্ত্রীপরিষদ গঠনের উপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। রাজা মন্ত্রী ও অন্যান্য রাজকর্মচারীদের নিয়ে গঠিত মন্ত্রীপরিষদের মাধ্যমে শাসনকার্য পরিচালনা করবেন বলে উল্লেখ করা হয়।

(viii) রাজতন্ত্র শাসিত

অর্থশাস্ত্রে রাষ্ট্র রাজতন্ত্র শাসিত। তবে এই রাজতন্ত্রের প্রকৃতি স্বৈরাচারীসম্পন্ন ছিল কি না, এ নিয়ে পণ্ডিতমহলে বিতর্ক রয়েছে। কেননা, রাজাকে ‘পোরান পকিতি’ বা প্রাকৃতিক নিয়ম ও দেশাচার মেনে চলতে হত। তবে সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে জনগণের ভূমিকা স্বীকার করা হয়নি।

(ix) গুপ্তচর নিয়োগ

শাসকের অবস্থান সম্পর্কে সুনিশ্চিত হতে এবং রাষ্ট্রশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য বিভিন্ন ধরনের গুপ্তচর নিয়োগের কথা বলা হয়েছে। যুবরাজ, প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের উপর গুপ্তচরবৃত্তি, রাষ্ট্রবিরোধী কার্যকলাপ ও মতামত জানতে রাজাকে সাহায্য করত। অর্থশাস্ত্রে গুপ্তচরদের বলা হয়েছে গূঢ়পুরুষ। কৌটিল্য এদের মূলত দুভাগে ভাগ করেছেন- স্থান থেকে খবর সংগ্রহ করবেন এবং সমস্থা অর্থাৎ, যারা নির্দিষ্ট সঞ্চরা অর্থাৎ, যারা রাজ্যের নানাস্থান পরিভ্রমণ করে সংবাদ সংগ্রহ করবেন।

(x) আইনের তত্ত্বাবধান ও রাজস্বনীতি নির্ধারণ

অর্থশাস্ত্রে রাষ্ট্রনীতি সম্পর্কিত আলোচনায় রাজকীয় অনুশাসনকে আইনের গুরুত্বপূর্ণ উৎসরূপে বর্ণনা করা হয়েছে। রাষ্ট্রের প্রধান হিসেবে রাজার নৈতিক দায়িত্ব হল আইনের যথাযথ প্রয়োগ, দোষীদের উপযুক্ত শাস্তিবিধান ও নিরপরাধকে পুরষ্কার প্রদান করা। কৌটিল্যের মতে, রাজা হলেন রাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থার প্রধান। তাছাড়া প্রজাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত কর আদায়ের মাধ্যমে রাজকোশাগার পূর্ণ রাখার নির্দেশও কৌটিল্য প্রদান করেছেন, যা প্রাচীন ভারতের রাষ্ট্রনীতি নির্ধারণে বিশেষভাবে সাহায্য করে।

রাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে কৌটিল্যের চিন্তাধারা পরবর্তী প্রজন্মকে নানাভাবে প্রভাবিত করে। তাঁর রাষ্ট্রনীতি এতটাই তাৎপর্যপূর্ণ যে, তা বর্তমানেও সমান প্রাসঙ্গিক হিসেবেই বিবেচিত হয়।

২। অর্থশাস্ত্রে কৌটিল্য বর্ণিত রাষ্ট্রতত্ত্ব বা ‘সপ্তাঙ্গ তত্ত্ব’ আলোচনা করো।
অথবা, কৌটিল্যের ‘সপ্তাঙ্গ তত্ত্ব’ সংক্ষেপে লেখো।

কৌটিল্য রচিত অর্থশাস্ত্র গ্রন্থটির ষষ্ঠ অধিকরণ মণ্ডলযোনি-তে রাষ্ট্রতত্ত্ব ও রাষ্ট্রপরিচালনার যেসকল নিয়মনীতি সম্পর্কে আলোচনা উপস্থিত, তার মধ্যে সপ্তাঙ্গ তত্ত্ব-এর ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। সপ্তাঙ্গ তত্ত্ব অনুযায়ী, কৌটিল্য রাষ্ট্রকে একটি সক্রিয় জীবদেহের সঙ্গে তুলনা করেছেন। একটি জীবদেহের যেমন বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ থাকে, তেমনই রাষ্ট্রপরিচালনার বিভিন্ন অঙ্গগুলি হল- স্বামী বা রাজা, অমাত্য, দুর্গ, জনপদ, কোশ, দণ্ড ও মিত্র। এগুলি একত্রে সপ্তাঙ্গ তত্ত্ব নামে পরিচিত।

কৌটিল্যের সপ্তাঙ্গ তত্ত্ব

কৌটিল্যের সপ্তাঙ্গ তত্ত্বের ব্যাখ্যা নিম্নে আলোচনা করা হল-

(i) স্বামী বা রাজা

সপ্তাঙ্গ তত্ত্বের প্রধান অঙ্গ স্বামী বা রাজা হলেন জীবদেহের মাথার সঙ্গে তুলনীয় এবং এখানে স্বামী শব্দটি প্রধান বা প্রভু অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে। কৌটিল্যের মতে, রাষ্ট্রপ্রধান হবেন উচ্চগুণসম্পন্ন ব্যক্তিত্ব। তিনি হবেন অভিজাত বংশীয় এবং অধিক জ্ঞানসম্পন্ন। তবে তাঁকে অবশ্যই ষড়রিপুর প্রভাব থেকে মুক্ত থাকতে হবে। শুধু তাই নয়, রাজা হলেন সকল ক্ষমতার উৎস এবং সমগ্র প্রশাসনিক ব্যবস্থার ভরকেন্দ্র।

তাঁর চারটি গুণ থাকা অবশ্যই প্রয়োজন, যথা- অভিগামিক গুণ (ধর্মপরায়ণতা, নম্রতা, বিচক্ষণতা ইত্যাদি), প্রজ্ঞাগুণ (ধীশক্তি, অনুধাবন শক্তি ইত্যাদি), উত্থান বা উৎসাহ গুণ (সাহস এবং দ্রুততার সঙ্গে কাজ শেষ করার ক্ষমতা) এবং আত্মসম্পদ গুণ (বাগ্মিতা, সংকটকালে অবিচলিত থাকা, শত্রুর সঙ্গে সন্ধি স্থাপনের দক্ষতা ইত্যাদি)। কৌটিল্য রাজাকে সর্বদা শাস্ত্রনির্দিষ্ট পথে ও সংযত হয়ে চলার নির্দেশ দিয়েছেন। প্রজাপালন ও প্রজাদের রক্ষা করা রাজার অবশ্যপালনীয় কর্তব্য।

(ii) অমাত্য

অমাত্য হল সপ্তাঙ্গ তত্ত্বের দ্বিতীয় অঙ্গ। এটিকে জীবদেহের চক্ষুর সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। সাধারণত অমাত্য বলতে মন্ত্রীদের বোঝায়, কিন্তু সপ্তাঙ্গ তত্ত্বে অমাত্য বলতে মন্ত্রী, কর্মসচিব বা উচ্চ রাজকর্মচারীদেরকেও বোঝানো হয়েছে। কৌটিল্য তাঁর অর্থশাস্ত্র গ্রন্থে অমাত্যদের নিয়োগ, কর্তব্য এবং দায়িত্বের বিষয়ে সবিশেষ আলোচনা করেছেন। এমনকি মন্ত্রী বা অমাত্য হিসেবে নিয়োগের পরে তাদের আরও বেশকিছু কঠিন পরীক্ষা নেওয়ার নির্দেশও দিয়েছেন তিনি। কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ অমাত্যরা নানান পদে নিযুক্ত হতেন, যেমন- পুরোহিত, সমাহর্তা, সন্নিধাতা, কোশাধ্যক্ষ, দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলার বিচারক, রাজদূত, বিভিন্ন দফতরের তত্ত্বাবধায়ক প্রমুখ। এ ছাড়া কৌটিল্য উল্লেখ করেছেন যে, রাজাকে মন্ত্রণা বা পরামর্শদানে যারা সাহায্য করবেন, তারা ছাড়াও আরও বেশ কয়েকজন মন্ত্রী নিয়ে মন্ত্রীপরিষদ গঠিত হবে। অমাত্যদের প্রধান কর্তব্যই হল, রাজকার্য পরিচালনায় রাজাকে সঠিকভাবে সাহায্য করা।

(iii) জনপদ

সপ্তাঙ্গ তত্ত্বে জনপদকে জীবদেহের পা-এর সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। অর্থশাস্ত্রে কৌটিল্য জনপদ শব্দটি জনসমষ্টি ও নির্দিষ্ট ভূখণ্ড উভয় অর্থেই ব্যবহার করেছেন। অর্থশাস্ত্র অনুযায়ী জনপদের বৈশিষ্ট্য হবে, সুজলা-সুফলা যেখানে কৃষকেরা অতি সহজেই ফসল উৎপাদন করতে পারবে এবং উৎপন্ন ফসলের একাংশ রাজাকে কর হিসেবে প্রদান করবে। এ ধরনের ভূখণ্ডে থাকবেন বিচক্ষণ প্রভু ও বিপুলসংখ্যক নিম্নশ্রেণিভুক্ত জনগণ। কৌটিল্য রাষ্ট্রের জনবল বাড়ানোর জন্য রাজাকে নতুন নতুন জনপদ গড়ে তোলার পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি নির্দেশ দিয়েছেন যে, জনপদের কোনও জমিই রাজা ফেলে রাখবেন না। যেসকল জমি কৃষিকাজের পক্ষে অনুপযুক্ত, সেখানে গবাদিপশুদের বাসস্থান বা রাজার জন্য মৃগবন নির্মাণের নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। এ ছাড়া অসহায় ও বিপদগ্রস্তদের রক্ষা করে রাজা জনপদের শান্তি বজায় রাখবেন বলেও উল্লেখ করা হয়।

কৌটিল্যের মতে, জনপদের আয়তন এমন হতে হবে যাতে তা স্বয়ম্ভরতা অর্জন করতে পারে। তাঁর মতে, ১০০ থেকে ৫০০ পরিবার নিয়ে এক-একটি গ্রাম গড়ে উঠবে। তাছাড়া অর্থশাস্ত্রে স্থানীয়কে জনপদের অন্তর্গত বৃহত্তম এককরূপে উল্লেখ করা হয়েছে। ৮০০টি গ্রাম নিয়ে এরকম একক গড়ে উঠবে।

(iv) দুর্গ

সপ্তাঙ্গ তত্ত্বের চতুর্থ অঙ্গ হল দুর্গ বা পুর, যা জীবদেহের হাতের সঙ্গে তুলনীয়। শত্রুর হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার সবচেয়ে সুরক্ষিত স্থান হিসেবে কৌটিল্য দুর্গ নির্মাণের নির্দেশ দিয়েছেন। দুর্গের গঠন, পরিখা, প্রাচীর প্রভৃতি নানান বিষয়ে অর্থশাস্ত্রে বিশদ আলোচনা উপস্থিত। অর্থশাস্ত্রের দ্বিতীয় অধিকরণে দুর্গবিধান অধ্যায়ে কৌটিল্য চার প্রকার দুর্গের কথা বলেছেন, যথা- জলদুর্গ (ঔদক দুর্গ), পার্বত্য দুর্গ (পার্ব্বত দুর্গ), মরূদুর্গ (ধাম্বন দুর্গ) এবং বনদুর্গ।

  • জলদুর্গ: এরূপ দুর্গ চারপাশে জলবেষ্টিত এলাকা নিয়ে গড়ে উঠত।
  • পার্বত্য দুর্গ: চারদিকে পাহাড়বেষ্টিত অথবা পাহাড়ের মধ্যে গড়ে ওঠা দুর্গ ছিল পার্বত্য দুর্গ।
  • মরুদুর্গ: মরু এলাকায় গড়ে ওঠা দুর্গ ছিল মরূদুর্গ।
  • বনদুর্গ: এই ধরনের দুর্গ বনাঞ্চলে নির্মাণ করা হত। এ ছাড়া যুদ্ধকালীন পরিস্থিতির মোকাবিলার জন্য কৌটিল্য রাজাকে প্রয়োজনীয় অস্ত্রশস্ত্র মজুত রাখার কথাও বলেছেন।

(v) কোশ

সপ্তাঙ্গ তত্ত্বের পঞ্চম উপাদান কোশ হল মূলত রাজকোশ। একে জীবদেহের মুখের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। কৌটিল্যের মতানুযায়ী, সৎ এবং ন্যায়সম্মতভাবে যে অর্থ অর্জন করা হয়েছে তাকে রাজা সঞ্চয় করে রাখবেন। কেননা, আপৎকালীন পরিস্থিতি (দুর্ভিক্ষ, মহামারি, আক্রমণ কিংবা এরূপ কোনও অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি) মোকাবিলার জন্য মূল্যবান ধাতু কিংবা নগদ অর্থের প্রয়োজন, যা তিনি রাজকোশ থেকে ব্যয় করতে পারবেন। তাছাড়া, কোশ এবং সামরিক শক্তির সম্পর্ক নিবিড়, রাজকোশে অর্থ না থাকলে স্থায়ী সেনাবাহিনী টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। কোশে অর্থের জোগান বৃদ্ধির জন্য কৌটিল্য নানারকম কর আদায়ের কথা বলেছেন। যেমন- প্রজাদের উপর আরোপিত ভূমিরাজস্ব, কৃষকদের থেকে প্রাপ্ত শস্যকর, সেচকর, ব্যবসায়ীদের থেকে সংগৃহীত পণ্যকর ইত্যাদি।

(vi) দন্ড

দণ্ড বলতে বোঝায় দমনমূলক ক্ষমতাকে। সাধারণভাবে সেনাবাহিনীর পরিপ্রেক্ষিতে এই ক্ষমতার কথা বলা হয়। সৈন্যবাহিনীতে পদাতিক, অশ্বারোহী, রথারোহী ও হস্তিবাহিনী থাকবে। অর্থশাস্ত্রের আলোচনা অনুসারে সেনারা হবে মূলত বংশানুক্রমিক এবং অনুগত। সেনাদের প্রকৃতি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে কৌটিল্য বলেছেন যে, সৈন্যরা হবে দক্ষ, ধৈর্যশীল এবং অবশ্যই রাজার আজ্ঞাবহ। এই সকল সৈন্য ও তাদের পরিবারের ভরণপোষণের দায়িত্ব থাকবে রাষ্ট্রের হাতে। সেনাবাহিনীতে কৌটিল্য ক্ষত্রিয়দের অগ্রাধিকার দিয়েছেন। তবে বৈশ্য ও শূদ্র সম্প্রদায়ভুক্ত যোগ্য ব্যক্তিরাও সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে পারে।

(vii) মিত্র

রাষ্ট্রের সপ্তম অঙ্গ বা উপাদান যা জীবদেহের কর্ণের সঙ্গে তুলনীয়, তা হল মিত্র বা সুহৃদ। সকল প্রয়োজনে যে সাহায্যের জন্য প্রস্তুত থাকে এবং যার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন হওয়ার আশঙ্কা থাকে না- সে হল মিত্র। রাষ্ট্রের অস্তিত্ব রক্ষার প্রয়োজনে বন্ধু রাজা বা মিত্র থাকা আবশ্যিক। কৌটিল্যের মতানুযায়ী, রাষ্ট্রের প্রতিবেশী রাষ্ট্র স্বভাবশত্রু এবং তার ঠিক পাশের রাষ্ট্র প্রথম রাষ্ট্রের স্বাভাবিক মিত্র। কোনও মিত্র একবার পরিত্যাগ করে আবার ফিরে এলে তাকে গ্রহণ করা উচিত নয়।

কৌটিল্য তাঁর অর্থশাস্ত্র গ্রন্থে যে সাতটি উপাদানের কথা উল্লেখ করেছেন, সেই সবকটি উপাদান তথা অঙ্গগুলিই একে অপরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পকযুক্ত। রাষ্ট্রে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা এবং তাকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রতিটি অঙ্গেরই সক্রিয়তা একান্ত প্রয়োজন।

৩। বারানির ফতোয়া-ই-জাহান্দারিতে রাজতন্ত্র ও রাষ্ট্রনীতি সম্পর্কে ধারণা কী ছিল?

সুলতানি যুগের শাসনব্যবস্থায় জিয়াউদ্দিন বারানি এবং তাঁর রচিত ফতোয়া-ই-জাহান্দারি গ্রন্থটির এক বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। তিনি এই গ্রন্থে সুলতানি যুগের বিভিন্ন বিষয় সুচারুরূপে বর্ণনা করেছেন। একজন শ্রেষ্ঠ সভাসদ হিসেবে সতেরো বছর মহম্মদ বিন তুঘলকের সঙ্গীরূপে তিনি সুলতানি দরবারে ছিলেন। ফিরোজ শাহ তুঘলকের আমলে দরবার থেকে বহিষ্কৃত হয়ে তিনি দুখানি মূল্যবান গ্রন্থ রচনা করেন, যার মধ্যে একটি হল ফতোয়া-ই-জাহান্দারি। এই গ্রন্থে একজন মুসলিম শাসকের আদর্শ রাজনৈতিক নীতি কেমন হবে তার পর্যালোচনা রয়েছে। তাঁর এই গ্রন্থ থেকে রাজতন্ত্র ও রাষ্ট্রনীতি সম্পর্কে সম্যক ধারণা লাভ করা যায়। :

বারানির ফতোয়া ই-জাহান্দারি গ্রন্থে রাজতন্ত্র সম্পর্কিত ধারণা

(i) রাজার নিরঙ্কুশ ক্ষমতা

বারানি বলেন যে, সুলতান বা বাদশাহ ঐশ্বরিক শক্তি (Divine Power) ও গুণাবলি দ্বারা শ্রীমণ্ডিত। এই মুসলিম শাসকেরা হলেন ঈশ্বরের ছায়া বা প্রতিবিম্ব (জিলুল্লাহ্)। তাই এই পার্থিব জগতের যাবতীয় হিতাহিত বা কল্যাণসাধনের দায়িত্ব ঈশ্বর তাঁর ওপর অর্পণ করেছেন। তবে শাসক তাঁর কাজের জন্য সাধারণের কাছে দায়বদ্ধ নন। সমস্ত কাজের জন্য তিনি ঈশ্বরের কাছেই দায়বদ্ধ।

(ii) রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ

ধর্মীয় আদর্শ থেকে বিচ্যুত জনগণকে সৎ পথে ফিরিয়ে আনার জন্য সুলতান রাজনৈতিকভাবে হস্তক্ষেপ করতে পারেন বলে বারানি অভিমত প্রকাশ করেছেন।

(iii) রাজ আইনের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন

রাজ আইন মেনে চলা বা তার প্রতি যথাযথ সম্মান জ্ঞাপন করা প্রতিটি মানুষের আবশ্যিক দায়িত্ব। রাজ আইনের যথার্থতা সম্পর্কে কোনও প্রশ্ন তোলা শুধু অন্যায় নয়, অনৈতিকও বটে।

(iv) রাজকীয় মর্যাদা প্রদর্শন

রাজতন্ত্রের মর্যাদা রক্ষার জন্য সুলতান নিজের আচরণে গাম্ভীর্য, দরবারে জাঁকজমক ও ব্যক্তিগত বিলাসব্যসনের ব্যবস্থা করতে পারেন। এ প্রসঙ্গে সর্বজনস্বীকৃত পারস্যের সাসানীয় রাজতন্ত্রের আদবকায়দা অনুসরণের কথা বারানি বলেন। এর মাধ্যমেই প্রজাবর্গ সুলতানকে মান্য করবে বলে তিনি মতপ্রকাশ করেছেন।

(v) আইনের সংরক্ষণ

ফতোয়া-ই-জাহান্দারিতে সুলতানের ইসলামি কর্তব্য হিসেবে শরিয়ত বা ধর্মীয় আইনের সংরক্ষণের কথা বলা হয়েছে। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে গিয়ে সুলতান প্রয়োজনে এই বিধানের সংশোধন বা পরিমার্জনও করতে পারেন।

বারানির ফতোয়া ই জাহান্দারি গ্রন্থে রাষ্ট্রনীতি সম্পর্কিত ধারণা

(i) শরিয়ত বা ধর্মীয় বিধিপালন

ফতোয়া-ই-জাহান্দারি গ্রন্থে বারানি রাষ্ট্রনীতি সংক্রান্ত ব্যাখ্যায় শরিয়ত বা ইসলাম ধর্মের বিধান অনুযায়ী রাজ্য শাসনের কথা বলেছেন। তাঁর মতে, একজন শাসকের প্রধান কর্তব্য হল শরিয়ত অনুযায়ী রাষ্ট্রপরিচালনা করা এবং ইসলাম ধর্মকে সুরক্ষাদানের সঙ্গে সেই ধর্মের প্রচার ও প্রসারের কাজে নিয়োজিত থাকা। এ ছাড়া তিনি একথাও বলেছেন যে, শাসক এমনভাবে রাজকর্তব্য পালন করবেন যেন ঈশ্বরদত্ত সকল ক্ষমতা ও সম্পদ বিধর্মীর বিনাশ এবং অন্যায় প্রতিরোধে ব্যবহৃত হতে পারে।

(ii) দুই রাজ্যের তত্ত্ব

জিয়াউদ্দিন বারানি দুই প্রকার রাজ্যের কথা বলেছেন, যথা-ঈশ্বরের রাজ্য ও ইহজগতের রাজ্য। তাঁর মতে, প্রকৃত ক্ষমতার অধিকারী ঈশ্বরের রাজ্যই হল যথার্থ রাজ্য। অন্যদিকে ইহজগতের রাজ্য ঈশ্বরের ইচ্ছায় পরিচালিত হয়। তিনিই ইহজগতের কাউকে দণ্ড দেন, আবার তিনিই কোনও ব্যক্তিকে রাজ্য প্রদান করে তাকে রাজা হিসেবে নির্বাচিত করেন। তাছাড়া ইহজগতের রাজ্য ও রাজাকে বারানি তিনটি ভাগে ভাগ করেছেন- প্রথম শ্রেণি (নবীর শাসন),  দ্বিতীয় শ্রেণি (পয়গম্বরের অনুসারী রাজ্য) ও তৃতীয় শ্রেণি (স্বৈরাচারী রাজতন্ত্র)।

(iii) জনকল্যাণমূলক কার্যাবলি

বারানির মতে, সুলতানকে সর্বদা প্রজা কল্যাণসাধনের কাজে যুক্ত থাকতে হবে। কারণ, রাষ্ট্রনীতি ও সুশাসন পরিচালনার জন্য জনকল্যাণমূলক কার্যাবলি সুষ্ঠুভাবে সম্পাদন করা বিশেষ প্রয়োজন। বিভিন্নরকম জনহিতকর কার্যাবলির মাধ্যমেই সুলতান প্রজাদের আনুগত্য অর্জনে সক্ষম হবেন।

(iv) ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা

ফতোয়া-ই-জাহান্দারি গ্রন্থে বারানি ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার উল্লেখ করেছেন। ঈশ্বরের রাজ্যে সব মানুষের সমান অধিকার আছে। তাই সুলতান প্রজাদের ন্যায়বিচার দিয়ে তাদের জীবন ও সম্পত্তির রক্ষা করবেন। বারানির মতে, ন্যায়বিচার হল মূলত সত্য, ন্যায় ও ধর্মের প্রতিষ্ঠা। ন্যায়ের মাপকাঠিতে রাষ্ট্র তার লক্ষ্যে অটুট থাকলে তার স্থায়িত্ব সুদৃঢ় হয় ও সমালোচনার ঊর্ধ্বে থাকে।

৪। দিল্লির সুলতানি রাষ্ট্রের প্রকৃতি আলোচনা করো।

দিল্লির সুলতানি রাষ্ট্রের প্রকৃতি/দিল্লির সুলতানি শাসন ধর্মাশ্রয়ী ছিল কি না-বিতর্ক

সুলতানদের শাসনকালে (১২০৬- ১৫২৬ খ্রিস্টাব্দ) ভারতের রাষ্ট্রব্যবস্থার স্বরূপ বা প্রকৃতি বিষয়টি ছিল গুরুত্বপূর্ণ। বস্তুত, সুলতানি রাষ্ট্রের প্রকৃতি বা চরিত্র ধর্মাশ্রয়ী (Theocratic State) ছিল কি না, তা নিয়ে সমকালীন ও আধুনিক ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতপার্থক্য লক্ষ করা যায়।

ধর্মাশ্রয়ী রাষ্ট্র – পক্ষে যুক্তি

ধর্মাশ্রয়ী রাষ্ট্রের ইংরেজি প্রতিশব্দ Theocratic State. গ্রিক শব্দ Theos থেকে উৎপত্তি ঘটেছে Theocracy বা দেবতাতন্ত্র শব্দটির। এই Theos-এর অর্থ হল ঈশ্বর। সরাসরি ঈশ্বর কর্তৃক কিংবা তাঁর প্রতিনিধি হিসেবে যাজক শ্রেণি (Sacerdotal Class) দ্বারা শাসিত রাষ্ট্রই হল ধর্মাশ্রয়ী বা দেবতাতান্ত্রিক রাষ্ট্র। সুলতানি রাষ্ট্রের ধর্মাশ্রয়ী চরিত্র সম্পর্কে আর পি ত্রিপাঠী, ঈশ্বরীপ্রসাদ, এ এল শ্রীবাস্তব প্রমুখ ঐতিহাসিকগণ বিভিন্ন যুক্তি প্রদান করেছেন-

(a)ফাতায়া-ই-জাহান্দারি গ্রান্থর ভাষ্য : ফতোয়া-ই-জাহান্দারি গ্রন্থে বারানি লিখেছেন যে, ধর্ম ও রাজনীতি পরস্পরের সহায়ক। মন্দ জগতকে কেবল ধর্মীয় পথেই শুদ্ধ করা যায়। সুলতান এমনভাবে শাসনকার্য পরিচালনা করবেন যাতে কোনও বিধর্মী কোনও বিষয়ে মুসলমানদের উপর প্রভুত্ব করতে না পারে। বারানির মতে, ইসলামের বিধানকে সর্বোচ্চ স্থানে প্রতিষ্ঠা করা শাসকের কর্তব্য।

(b) খলিফাতন্ত্রের প্রতি আনুগত্য: বিশিষ্ট আরব পণ্ডিত ইবন খালদুন-এর মতে, অনুশাসনিক প্রয়োজনে খিলাফৎ-এর সৃষ্টি। তাই প্রতিটি মুসলমানের খলিফার প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন ছিল বাধ্যতামূলক। ভারতের সুলতানি আমলের প্রায় সব শাসকই খলিফাতন্ত্রের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করতেন। যেমন- (i) ইলতুৎমিস খলিফার প্রতিনিধি হিসেবে স্বীকৃতিপত্র (মনসুর) সংগ্রহ করেন। (ii) বলবন তাঁর মুদ্রায় খলিফার নাম উৎকীর্ণ করার পাশাপাশি নিজেকে খলিফার সহকারী বলে প্রচার করেন। (iii) ফিরোজ শাহ তুঘলক নিজে খলিফার নায়েব উপাধি নেন, খলিফার নামে খুতবা পাঠ এবং মুদ্রা খোদাই করেন। খলিফাতন্ত্রের প্রতি এই আনুগত্য ও মান্যতা সুলতানি রাষ্ট্রব্যবস্থায় ধর্মকেন্দ্রিকতার প্রমাণ দেয়।

(b) উলেমাতন্ত্রের প্রভাব: আক্ষরিক অর্থে যাঁরা জ্ঞান (ইলম) অর্জন করেন, তাঁরাই আলিম। এঁদের বহুবচনে বলা হয় উলেমা। এই উলেমারা ছিলেন শরিয়তের ব্যাখ্যাকর্তা। তাঁদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী সুলতানগণ শাসন পরিচালনা করতেন। মুসলিম বুদ্ধিজীবী শ্রেণি উলেমাদের রাজনৈতিক প্রভাব ও কর্তৃত্ব সুলতানি রাষ্ট্রকে ধর্মাশ্রয়ী করেছিল।

এক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় উল্লেখ্য- (i) সুলতানি শাসনকালে উলেমাদের এক বৃহৎ অংশ সরকারি কাজে হস্তক্ষেপ করতে শুরু করেন। এঁরা ধর্মীয় আইনের ভিত্তিতে প্রশাসনকে চালিত করতে প্রয়াসী হন। (ii) সামাজিক ক্ষেত্রেও উলেমাদের বিশেষ প্রভাব ছিল। আলাউদ্দিন খলজির আগে পর্যন্ত আগত সুলতানেরা উলেমাদের মতামতকে অগ্রাহ্য করতে ভয় পেতেন। (iii) রোমিলা থাপার লিখেছেন যে, ‘ধর্ম ও রাজনীতির মিলনের ফলে রাজ্যশাসনে উলেমাদের প্রভাব অস্বীকার করা সম্ভব ছিল না। উলেমাদের সন্তুষ্টিবিধানের জন্য সুলতানরা তাঁদের ভূমিদান করতেন, মাঝে মাঝে দেবমূর্তি ও হিন্দুমন্দির ধ্বংস করে অমুসলমান-বিরোধী ভাবমূর্তি তুলে ধরতেন।’

(c) ধর্মকেন্দ্রিক আইনবিধি: ঈশ্বরীপ্রসাদের মতে, সুলতানি আমলের আইনগুলি ইসলামীয় ধর্মশাস্ত্রের ভিত্তিতেই তৈরি হয়েছিল। রাজকীয় অনুশাসনের ভিত্তি ছিল শরিয়তের ভাষ্য। রাজস্ব আইনের ভিত্তি ছিল ধর্মের বিধান। অমুসলমান হিসেবে হিন্দুরা জিজিয়া কর দিতে বাধ্য ছিলেন। ড. ঈশ্বরীপ্রসাদের মতে, শরিয়তের বিধান অনুযায়ী সুলতানি করব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল। অমুসলমানদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হিসেবে গণ্য করা হত।

ধর্মাশ্রয়ী রাষ্ট্র-বিপক্ষে যুক্তি

মহম্মদ হাবিব, কে এম আশরাফ, সতীশচন্দ্র, ড. মুজিব, ড. হাবিবউল্লাহ, ড. নিজামি, ড. ইফতিকার আলম খান, ইশতিয়াক হোসেন কুরেশী প্রমুখ ঐতিহাসিকগণ ধর্মাশ্রয়ী রাষ্ট্রের বিপক্ষে যেসকল মত প্রদান করেছেন, তা হল নিম্নরূপ-

(a) জিয়াউদ্দিন বারানির অভিমত : বারানি ইসলামকে ধর্মপথে ফিরিয়ে আনার প্রয়োজনে ধর্মমুখী রাজতন্ত্রের কথা বলেছিলেন। কিন্তু তিনিও নিশ্চিত ছিলেন যে, ধর্মীয় অনুজ্ঞা বা অস্ত্রের জোরে সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু অধ্যুষিত ভারতে ধর্মীয় রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। তাই ‘ফতোয়া’ গ্রন্থের অন্যত্র তিনি ইহজাগতিক রাজ্যকে তিনভাগে বিভক্ত করেছেন। তৃতীয় শ্রেণির রাজ্য হিসেবে তিনি সেইসব রাজ্যের কল্পনা করেছেন যেখানে রাজা স্বৈরাচারী এবং তাঁর শাসনপ্রণালী কোরান বা শরিয়তের আদর্শের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তিনি শাসকের অন্তরের সৌন্দর্য প্রকাশের উপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন।

(b) খলিফার প্রতি বাহ্যিক আনুগত্য: দিল্লির সুলতানদের খলিফার প্রতি আনুগত্য ছিল বাহ্যিক এবং প্রয়োজনভিত্তিক। সুলতানরা ব্যক্তিগত প্রতিভা ও উদ্যোগে ভারতে ক্ষমতাসীন হয়েছিলেন। মুসলিম মিল্লাতকে পক্ষে রাখার প্রয়োজনে কেউ কেউ হয়ত খলিফার অনুমোদন নিয়েছিলেন। কিন্তু তা ধর্মীয় আদর্শ বা প্রেরণা থেকে নয়, বাস্তব রাজনৈতিক প্রয়োজন থেকে। সুলতানদের কেউ কেউ নিজের নামে খুতবা পাঠ ও মুদ্রায় নিজেদের নাম খোদাই করতেন। জানা যায়, আলাউদ্দিন খলজি ও মহম্মদ বিন তুঘলকের মতো কয়েকজন সুলতান খলিফার অনুমোদন অগ্রাহ্য করার ক্ষমতা রাখতেন। মুবারক শাহ নিজেকেই খলিফা বলে দাবি করেছেন। অর্থাৎ এক্ষেত্রে ধর্মীয় আনুগত্য নয়; খলিফার অনুমোদন নিয়ে নিজের স্বৈরাচারী ক্ষমতাকে একটা বৈধতা দেওয়ার ইচ্ছা সক্রিয় ছিল মাত্র।

(c) উলেমাদের প্রভাব অতিরঞ্জন মাত্র : দিল্লির সুলতানরা ছিলেন ক্ষমতা ও স্বৈরাচারের প্রতীক। কিছু সরকারি পদে উলেমাদের নিয়োগ করলেও, তাঁদের হাতের পুতুল সুলতানরা ছিলেন না। আবার উলেমারাও জানতেন যে, দিল্লির সুলতানদের কর্তৃত্ববাদের সঙ্গে আপস করতে না পারলে অস্তিত্ব রক্ষা সম্ভব হবে না। অর্থাৎ দিল্লি সুলতানির শাসনে উলেমাদের প্রভাব ছিল গৌণ। ইলতুৎমিসের আমলে উলেমা শ্রেণি সুলতানকে কঠোর ইসলামীয় আইন প্রয়োগের অনুরোধ জানালে সুলতান তা প্রত্যাখ্যান করেন। *2 আবার মহম্মদ বিন তুঘলক, গিয়াসউদ্দিন বলবন প্রমুখের আমলে উলেমাদের ক্ষমতা যথেষ্ট হ্রাস করা হয়। কে এম আশরাফ লিখেছেন যে, দিল্লি সুলতানি ছিল ব্যক্তিকেন্দ্রিক স্বৈরশাসন। রাজশক্তির এমন জ্বলন্ত স্বেচ্ছাচারিতার সঙ্গে কোরানের আদর্শের সামঞ্জস্যবিধান অসম্ভব।

(d) জাওয়াবিত (নির্দেশনামা) জারির স্বাধীনতা : দিল্লির সুলতানরা বাস্তবে ছিলেন সম্পূর্ণ স্বাধীন ও সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী। রাষ্ট্রের প্রয়োজনে তারা জাওয়াবিত (নির্দেশনামা) জারি করতেন। এর সঙ্গে ধর্মীয় নির্দেশের আদৌ কোনও সামঞ্জস্য ছিল না, বরং অনেক নির্দেশ ছিল কোরানের ভাষ্যের বিপরীত। কোরান ও শরিয়তি আইনের বাইরে আইন বা নির্দেশ জারির এই রাজকীয় অধিকার ধর্মাশ্রয়ী রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রতিফলন হতে পারে না।

(e) শরিয়ত বহির্ভূত নির্দেশ : সুলতানি আমলের বহু নির্দেশনামা শরিয়তের ভাষ্যের বিপরীত ছিল। যেমন- (i) শরিয়তের বিধান অনুসারে সুদ গ্রহণ নিষিদ্ধ। কিন্তু সুলতানি আমলে বাণিজ্যের প্রয়োজনে সুদ গ্রহণ স্বীকৃত ছিল। (ii) ইসলামের বিধান অনুসারে জিম্মি (যেমন- ইহুদি, খ্রিস্টান, হিন্দু)-রা জিজিয়া প্রদানের বিনিময়ে, মুসলিম রাষ্ট্রে বসবাসের অধিকারী। কিন্তু সুলতানি আমলে হিন্দুরা নাগরিক হিসেবে বসবাস করা ও সরকারি চাকুরি করার অধিকার পেতেন। (iii) শরিয়তে প্রাণদণ্ড নিষিদ্ধ ছিল, কিন্তু সুলতানি রাষ্ট্রে মুসলমানদের প্রাণদণ্ড দেওয়া হত। অর্থাৎ ইসলাম স্বীকৃত নয় এমন বহু সুযোগসুবিধা সুলতানি আমলে চালু ছিল।

মূল্যায়ন

সবশেষে বলা যায়, দিল্লির সুলতানি রাষ্ট্রের প্রকৃতিতে ভিন্নধর্মী ও মিশ্র বৈশিষ্ট্য পরিলক্ষিত হয়। তবে ঐতিহাসিক তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে এ কথা বলা যায় যে, মধ্যযুগের ভারতবর্ষের সুলতানির রাষ্ট্রের প্রকৃতি ধর্মাশ্রয়ী ছিল না। বেশিরভাগ ঐতিহাসিক-এর ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রের উপরই অধিক গুরুত্ব আরোপ করেছেন। আরও সাম্প্রতিক গবেষণার ফলস্বরূপ বহু ঐতিহাসিক দিল্লির সুলতানি রাষ্ট্রের প্রকৃতিকে সামরিক ও অভিজাততান্ত্রিক বলে আখ্যায়িত করেছেন।

৫। পারস্যের ‘ক্ষত্রপ’ ও চিনের ‘ম্যান্ডারিন’-এর বর্ণনা দাও

প্রতিটি দেশের শাসন পরিচালনার জন্য একটি সুদক্ষ শাসন সংগঠনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঠিক সেরকমই অতীতে সুবিশাল সাম্রাজ্যের শাসকেরা তাদের প্রশাসনিক কার্যকলাপ পরিচালনার জন্য দক্ষ প্রশাসক বা শাসন সংগঠন গড়ে তোলেন, যেমন- পারস্যের ক্ষত্রপ বা স্যাট্রাপ ও চিনের ম্যান্ডারিন।

পারস্যের স্যাট্রাপ বা ক্ষত্রপ

পারস্য সাম্রাজ্য বিশ্বের সবথেকে শক্তিশালী সাম্রাজ্যগুলির মধ্যে ছিল অন্যতম। ৫৩০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে সাইরাস এই সাম্রাজ্যের পরিধির বিস্তার ঘটান। এই সুবিশাল সাম্রাজ্যকে পরিচালনার জন্য তিনি তাঁর সাম্রাজ্যকে ক্ষুদ্র-বৃহৎ কয়েকটি প্রদেশে ভাগ করেন। এই প্রদেশগুলিকেই স্যাট্রাপি বলা হত। প্রত্যেকটি স্যাট্রাপিতে নিয়োগ করা হত প্রাদেশিক শাসনকর্তা, যারা পরিচিত ছিলেন স্যাট্রাপ বা ক্ষত্রপ নামে। সাইরাস এই ব্যবস্থার সূত্রপাত করলেও প্রথম দরায়ুস এই স্যাট্রাপি ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ রূপ দান করেন।

স্যাট্রাপ শব্দের উৎপত্তি ও অর্থ

স্যাট্রাপি ও স্যাট্রাপ-এই দুই শব্দের উৎপত্তি হয়েছে গ্রিক শব্দ স্যাট্রাপিয়া থেকে। পারসিক ধারণা অনুযায়ী সাম্রাজ্যের রক্ষাকর্তা হলেন স্যাট্রাপ। অপর মত অনুযায়ী, সংস্কৃত শব্দ ক্ষত্রিয় থেকে স্যাট্রাপ বা ক্ষত্রপ শব্দটির উৎপত্তি। তাছাড়াও এই শব্দটির আভিধানিক অর্থ হল- প্রাচীন পারস্যের প্রদেশগুলির শাসক।

স্যাট্রাপদের নিয়োগ এবং মর্যাদা

পারসিক সম্রাটগণই স্যাট্রাপদের প্রাদেশিক শাসনকর্তা হিসেবে নিযুক্ত করতেন। এই স্যাট্রাপরা ছিলেন মূলত রাজপরিবার বা অভিজাত পরিবারের সদস্য। স্যাট্রাপের পুত্রই স্যাট্রাপ হতে পারতেন অর্থাৎ, এই ব্যবস্থা ছিল বংশানুক্রমিক। মর্যাদার দিক থেকেও এই স্যাট্রাপগণ ছিলেন প্রদেশের গভর্নরের সমান।

স্যাট্রাপদের কার্যাবলি

স্যাট্রাপ বা ক্ষত্রিয়রা যেসকল দায়িত্বগুলি পালন করতেন সেগুলি হল- (a) স্যাট্রাপরা সামরিক দায়িত্ব পালন করতেন যেমন- সৈনিক নিয়োগ, দুর্গগুলির রক্ষণাবেক্ষণ, সৈন্যদের সুবিধারক্ষার্থে পথঘাট নির্মাণ প্রভৃতি। (b) স্যাট্টাপগণ প্রদেশগুলি থেকে কর বা রাজস্ব আদায় করতেন। সেই রাজস্ব নির্দিষ্ট সময়ে কেন্দ্রীয় কোশাগারে জমা দিতেন। (c) প্রদেশগুলিতে বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন কাজের জন্য স্থানীয় কর্মচারী বা আমলাদের নিয়োগের দায়িত্বও পালন করতেন স্যাট্রাপরা। (d) স্যাট্রাপরা দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলার বিচার করতেন। এককথায় স্যাট্রাপরা ছিলেন প্রদেশগুলির সর্বোচ্চ বিচারক। পাশাপাশি স্যাট্রাপগণ আইনশৃঙ্খলা, সুশাসন ও নিরাপত্তা রক্ষার দায়িত্ব পালন করতেন, যাতে সাধারণ মানুষ নিরাপদে থাকতে পারে।

সম্রাটদের সঙ্গে স্যাট্রাপদের সম্পর্ক

স্যাট্টাপরা যাবতীয় কার্যের জন্য সম্রাটের প্রতি দায়বদ্ধ থাকতেন। তারা স্যাট্রাপির শাসন পরিষদকে সম্রাটের প্রতিনিধি হিসেবে নিয়ন্ত্রণ করতেন। স্যাট্রাপরা নিজেদের দায়িত্ব পালনে অবহেলা করলে সম্রাটরা স্যাট্রাপদের সতর্ক করে দিতেন। সম্রাটরা আগাম সতর্ক করে দেওয়ার পরও যদি স্যাট্রাপরা তাদের দায়িত্ব পালনে অবহেলা করতেন, তাহলে সম্রাট তাদের সেই পদ থেকে পদচ্যুত করতে পারতেন।

স্যাট্রাপদের বিদ্রোহ

স্যাট্রাপদের বিদ্রোহ শুরু হয় খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়ে। দরায়ুসের আমলেও স্যাট্রাপিতে বিদ্রোহ দেখা যায়। সেই বিদ্রোহ দমন করেন প্রথম দরায়ুস। সম্রাট জারেক্সেস-এর আমলেও বিদ্রোহ লক্ষ করা যায়। স্যাট্রাপগণ সবথেকে বড়ো আকারের বিদ্রোহ ঘোষণা করেন তৃতীয় আলেকজান্ডারের সময়কালে।

স্যাট্রাপদের বিলোপ

প্রশাসনিক স্তরে স্যাট্রাপ বা ক্ষত্রপদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা বংশানুক্রমিক হয়ে পড়ে। এর ফলে অযোগ্যদের প্রবেশ ঘটায় প্রশাসনিক ব্যবস্থা হয়ে পড়ে দুর্বল। স্যাটাপরাও বারংবার বিদ্রোহ করার ফলে সাম্রাজ্যের ভিত্তি শিথিল হয়ে যায়। পরবর্তীকালে স্ট্যাটেগো নামক কর্মচারীদের উত্থান ঘটলে স্যাট্রাপদের বিলোপসাধন হয়।

চিনের ম্যান্ডারিন ব্যবস্থা

চিনে মাঞ্জু রাজবংশের শাসনকালে সরকারি কাঠামোয় আমূল পরিবর্তন ঘটে। নতুনভাবে আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে রূপ দান করা হয়। খ্রিস্টীয় সপ্তম শতক থেকে বিশ শতকের সূচনাকালে চিনে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রে যে আমলাতান্ত্রিক গোষ্ঠী গড়ে ওঠে, তা পরিচিত ম্যান্ডারিন নামে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে চিনে সরকারি কর্মচারীদের বিবর্তনের মধ্য দিয়ে ম্যান্ডারিন পদটি যথার্থ রূপ লাভ করে।

ম্যান্ডারিন ব্যবস্থার উৎস ও অর্থ

ইংরেজি ‘ম্যান্ডারিন’ শব্দটির উৎপত্তি পোর্তুগিজ শব্দ ম্যান্ডারিম থেকে। গবেষকদের মধ্যে অনেকেই অনুমান করেন এই ভাষাটি পোর্তুগিজরা মালয়ী ভাষা থেকে গ্রহণ করেছেন এবং মালয়ীরা এই শব্দটি গ্রহণ করেছে মন্ত্রিণ শব্দ থেকে। মালয়েশিয়ার উংকু আবদুল আজিজ-এর মতে, সুলতানি আমলে মালাক্কায় যেসকল পোর্তুগিজরা বসবাস করত, তাদের মধ্যে উচ্চপদস্থ কর্মচারীদের বলা হত মেস্তেরিন। এই শব্দেরই বিবর্তিত রূপ হল ম্যান্ডারিন।

যোগ্যতা

কঠোর পরীক্ষার মাধ্যমে ম্যান্ডারিনদের নিয়োগ করা হত। জন্ম এবং বংশপরিচয়ের পাশাপাশি যে বিষয়গুলির উপর গুরুত্ব আরোপ করা হত সেগুলি হল- প্রশাসনিক দক্ষতা, শিক্ষাগত যোগ্যতা, চিনা ঐতিহ্যের পৃষ্ঠপোষকতা ও রাজনৈতিক বিচক্ষণতা প্রভৃতি। তবে পাহারাদার, অপরাধী, বণিক, সংগীতজ্ঞ প্রমুখ ব্যক্তিদের ম্যান্ডারিন পদপ্রার্থী হিসেবে পরীক্ষায় বসার জন্য যোগ্য বলে বিবেচনা করা হত না।

নিয়োগ

ম্যান্ডারিন পদে প্রথমদিকে সম্রাটের আত্মীয় বা পরিচিতরা নিযুক্ত হতে পারতেন। পরবর্তীকালে এই পদে নিয়োগ করার ক্ষেত্রে যোগ্যতা নির্ণায়ক পরীক্ষা নেওয়া হত। পরীক্ষায় মূলত সাহিত্য, কনফুসীয় দর্শন, তাওবাদ, সাধারণ জ্ঞান, রাজনীতি বিষয়ক প্রশ্ন করা হত। পরীক্ষায় উত্তীর্ণ প্রার্থীদের গুণগতমান অনুযায়ী কেন্দ্রীয়, প্রাদেশিক বা স্থানীয় অঞ্চলে নিয়োগ করা হত।

ম্যান্ডারিনদের স্তর ও পোশাক-পরিচ্ছদ

পদমর্যাদার দিক থেকে ম্যান্ডারিনদের দুটি স্তর ছিল। প্রথম শ্রেণির অর্থাৎ, উচ্চশ্রেণির ম্যান্ডারিনরা চিনা প্রধানমন্ত্রীর সমপর্যায় ছিলেন। তাদের পোশাকে সারস পাখির চিহ্ন আঁকা হত। তারা পদ্মরাগমণিযুক্ত টুপি ব্যবহার করতেন। দ্বিতীয় শ্রেণির অর্থাৎ, সাধারণ ম্যান্ডারিনরা স্থানীয় প্রশাসন পরিচালনা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করতেন। এঁদের পোশাকে সোনার লেজযুক্ত পাখির চিহ্ন আঁকা হত। তারা সোনা, রুপো, প্রবাল দেওয়া টুপি ব্যবহার করতেন।

ম্যান্ডারিনদের কার্যাবলি

ম্যান্ডারিনরা প্রশাসনিক ক্ষেত্রে যেসকল কার্যকলাপ পরিচালনা করতেন সেগুলি হল- ম্যান্ডারিনরা সম্রাটকে প্রশাসনিক কাজে পরামর্শ প্রদান করতেন। এ ছাড়া উচ্চপদস্থ কর্মচারীরা অন্যান্য বিষয়েও সহায়তা প্রদান করতেন। প্রদেশ বা স্থানীয় অঞ্চলগুলিতে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখার দায়িত্ব থাকত সাধারণ বা নিম্নপদস্থ কর্মচারীদের। ম্যান্ডারিনরা চিনের স্থানীয় শাসক ও রাজার মধ্যে যোগাযোগ রক্ষার কাজ করতেন। এ ছাড়াও চিনের ঐতিহ্য রক্ষা করা ছিল তাদের অন্যতম কর্তব্য। সম্রাটের দরবারে বৈদেশিক সম্পর্ক, নিরাপত্তা, আইন, বিচার প্রভৃতি ক্ষেত্রে ম্যান্ডারিনরা যুক্ত থাকতেন। গ্রামাঞ্চলে কর বা রাজস্ব সংগ্রহেও তাদের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

অবসান

ম্যান্ডারিনরা আর্থিক দিক থেকে সম্পদশালী হয়ে উঠেছিল। নিজেদের বিলাসবহুল জীবনযাপনের দরুন তারা সাধারণ মানুষের থেকে অনেকটা দূরে সরে গিয়েছিল। ম্যান্ডারিনদের নিয়োগের ক্ষেত্রে যে পরীক্ষাব্যবস্থা চালু ছিল, ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রভাবে তা বন্ধ হয়ে যায়। শেষপর্যন্ত ১৯১১ খ্রিস্টাব্দে চিনে মাঞ্জু বংশের পতনের সঙ্গে সঙ্গে ম্যান্ডারিন ব্যবস্থার অবসান ঘটে এবং আধুনিক প্রশাসনিক ব্যবস্থার সূত্রপাত হয়।

৬। ইক্তা ব্যবস্থার বিবর্তন আলোচনা করো

দিল্লির সুলতানি রাষ্ট্রব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল ইক্তা ব্যবস্থা। ভারতে দিল্লির সুলতানরা এই ব্যবস্থার প্রবর্তন করেন। ইক্তাদারি ব্যবস্থা তুর্কীদের মধ্যে আগে থেকেই প্রচলিত ছিল। ভারতে আসার আগেই তারা এই ব্যবস্থা সম্পর্কে পরিচিত ছিল। ইলতুৎমিসের সময়ে ভারতে ইক্তা ব্যবস্থা বৈধ ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। কালক্রমে প্রাদেশিক শাসনের ভিত্তি হিসেবে ও প্রশাসনের অপরিহার্য অঙ্গ হিসেবে ইক্তা প্রাতিষ্ঠানিক চরিত্র অর্জন করে।

ইলতুৎমিসের আমল

  1. ইলতুৎমিসের আমলে ভারতে প্রথম খালিসা জমি সংরক্ষণের প্রমাণ পাওয়া যায়। দিল্লির পার্শ্ববর্তী কিছু অঞ্চল এবং দোয়াবের কিছু অংশ খালিসার অন্তর্ভুক্ত ছিল।
  2. ইলতুৎমিস এই জমির রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব তুর্কি সেনাপতিদের হাতে অর্পণ করেন।
  3. এই ভূখণ্ডের রাজস্বকে সেনাবাহিনীর ভরণ- পোষণ ও সেনানায়কদের বেতন হিসেবে গণ্য করা হত।
  4. এই ব্যবস্থাকে ভারতে ইক্তা প্রথার আদিপর্ব বলা যায়। এই সময় জমির প্রাপকের কাছে কোনও রাজস্ব অর্থ দিল্লি দাবি করত না।
  5. ইক্তার প্রাপকদের মধ্যে ক্ষমতা দখলের প্রবণতা এবং সুলতানের বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। তাই ইলতুৎমিস মুকৃতিদের অধীন ইকতা জমি বদলি করার নীতি নেন।

গিয়াসউদ্দিন বলবনের আমল

ইলতুৎমিসের মৃত্যু এবং গিয়াসউদ্দিন বলবনের সিংহাসনে বসার মধ্যবর্তীকালে (১২৩৬-১২৬৬ খ্রিস্টাব্দ) ইক্তা ব্যবস্থা বিশৃঙ্খল হয়ে পড়ে। বলবন কঠোর হাতে ইতা ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা পুনঃপ্রবর্তনের উদ্যোগ নেন। এজন্য তিনি-

  1. রাষ্ট্রের অধীনে জমি ও ভাতা ভোগ করা সত্ত্বেও যেসকল মুক্তি প্রয়োজনে সুলতানকে সামরিক সাহায্য প্রদান করতেন না, তাদের তালিকা তৈরি করার নির্দেশ দেন। সেই সঙ্গে মৃত এবং বৃদ্ধ মুক্তিদের বরাদ্দ করা ইক্কা কেড়ে নেন। যদিও শেষপর্যন্ত বৃদ্ধদের ইক্তা বহাল রাখা হয়। বলবন মূলত শারীরিকভাবে সক্ষম ও উপযুক্ত ব্যক্তিদেরই রাজস্ব ভোগের অধিকার দেন।
  2. মুক্তির কাছ থেকে ইক্তার উদ্বৃত্ত রাজস্ব দিল্লিতে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেন।
  3. ইক্তার রাজস্বের আয়ব্যয়ের সঠিক হিসাব পরীক্ষার জন্য খোয়াজা নামক কর্মচারী নিয়োগ করেন।

আলাউদ্দিন খলজির আমল

আলাউদ্দিন খলজির সময় সাম্রাজ্যের পরিধি আরও বিস্তার লাভ করে। বলবনের নীতি থেকে কিছুটা সরে এসে ইক্তা ব্যবস্থার ক্ষেত্রে তিনিও কিছু নতুন নীতি অবলম্বন করেন, সেগুলি হল-

  1. সুলতান দিল্লির পার্শ্ববর্তী অঞ্চলকে খালিসায় পরিণত করেন এবং দূরবর্তী অঞ্চলগুলিতে ইক্তা ব্যবস্থা বজায় রেখে রাজস্ব সংগ্রহের ব্যবস্থাকে সুনিশ্চিত করেন।
  2. সুলতানের অশ্বারোহী সেনাবাহিনীকে ইকতা দানের বদলে নগদে বেতন প্রদানের ব্যবস্থা করা হয় এবং অন্যদিকে সুলতানের সেনাপতি বা সৈন্যবাহিনীর উচ্চশ্রেণির আধিকারিকদের ক্ষেত্রে ইক্তা প্রদান বহাল থাকে। স্থির হয় যে, দেওয়ান-ই-ওয়াজিরৎ বিভাগ মুক্তিদের দেওয়া ইক্তার মোট রাজস্ব নির্ধারণ করবে।
  3. ইক্তার ভূখণ্ডকে দু’ভাগে ভাগ করে এক ভাগ থেকে সেনাবাহিনীর রক্ষণাবেক্ষণ ও সেনাদের বেতন প্রদান এবং দ্বিতীয় ভাগ থেকে মুক্তির প্রশাসনিক অর্থব্যয় নির্দিষ্ট করা হয়।
  4. সেনাবাহিনীর ব্যয় এবং মুক্তি ও ইক্তার ব্যয়সংকুলানের পর উদ্বৃত্ত রাজস্ব সুলতানের দফতরে জমা দিতে বলা হয়।
  5. প্রতিটি ইক্তার নিয়মিত বার্ষিক আয়ব্যয় পরীক্ষার উপর জোর দেওয়া হয় এবং হিসাবে কারচুপি কিংবা উদ্‌বৃত্ত রাজস্ব দিল্লিতে জমা দেওয়ার কাজে গাফিলতি ধরা পড়লে কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়।

গিয়াসউদ্দিন তুঘলকের আমল

গিয়াসউদ্দিন তুঘলক ইকতা ব্যবস্থায় পরিবর্তনের বদলে নীতির কঠোরতা শিথিল করে দেন এবং কয়েকটি সংশোধনীমূলক নীতি গ্রহণ করেন। যেমন- মুক্তিরা তাদের অধীনস্থ কর্মচারীদের প্রাপ্য বেতনের এক শতাংশও কম দিতে পারবেন না। পাশাপাশি মুকৃতিদের কর্মচারীরাও প্রাপ্ত বেতনের অতিরিক্ত অর্থ সংগ্রহ করলেও তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে না।

মহম্মদ বিন তুঘলকের আমল

মহম্মদ বিন তুঘলকের আমলে ইক্তা ব্যবস্থায় কিছু মৌলিক পরিবর্তন ঘটে।

  1. এসময় রাজস্ব আদায় এবং সেনা রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পৃথক করে দেওয়া হয়।
  2. রাজস্ব আদায়ের ভার নিলাম ডেকে সর্বোচ্চ নিলামদারকে ইজারা (Contract) দেওয়া হয়। ইজারাদারকে সেনাবাহিনী পোষণের দায়িত্ব পালন করতে হত না।
  3. সর্বনিম্নে সিপাহশালার থেকে ঊর্ধ্বক্রমে খান পদমর্যাদার সেনানায়করা বেতন বাবদ ইক্তা বরাদ্দ পেতেন। সাধারণ সেনাদের নগদ টাকায় বেতন দেওয়া হত।

ফিরোজ শাহ তুঘলকের আমল

মহম্মদ বিন তুঘলক ইক্তা ব্যবস্থায় বিভিন্ন নীতি গ্রহণের ক্ষেত্রে যে কঠোরতা দেখিয়েছিলেন, তা ইক্‌তাদারদের অসন্তুষ্ট করেছিল। সেকারণে ফিরোজ শাহ তুঘলক তাদের সন্তুষ্ট করতে কতকগুলি কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন। তবে এতে ইক্তা ব্যবস্থার মৌলিক কাঠামো ভেঙে পড়ে।

  1. তিনি অভিজাতদের বেতন ও অন্যান্য সুযোগসুবিধা প্রচুর বৃদ্ধি করলে তার প্রভাব পড়ে ইক্তা ব্যবস্থাতেও। যেমন- খান পদমর্যাদার একজন অভিজাতের বার্ষিক বেতন ২ লক্ষ তঙ্কা থেকে বেড়ে হয় ৪ থেকে ৮ লক্ষ তঙ্কা।
  2. সেনাবাহিনীর সকল সদস্যকে নগদ অর্থের বদলে বেতন খাতে ইক্কা বরাদ্দ করা হয়।
  3. গ্রামাঞ্চলে সেনারা জমির খাজনা আদায় করে নিজেদের বেতন সংগ্রহের অধিকার পায়। একে বলা হত ওয়াঝ বা মোয়াজব (অর্থাৎ বেতনের বিকল্প)।
  4. ফিরোজ শাহ সরকারিভাবে ইক্তার উপর মুক্তির বংশানুক্রমিক অধিকার মেনে নেন।
  5. ইক্তার আয় বার্ষিকভাবে নির্ধারণের পরিবর্তে সমগ্র শাসনকালের জন্য নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়।

লোদি বংশের আমল

ফিরোজ শাহ তুঘলক যেভাবে ইক্তার উপর সুলতানের নিয়ন্ত্রণ শিথিল করেছিলেন তা পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। লোদি বংশের শাসনকালে (১৪৫১-১৫২৬ খ্রিস্টাব্দ) ইক্তা ব্যবস্থার নতুন কোনও পরিবর্তন ঘটেনি।

  1. তবে এই সময় ইক্তা-র পরিবর্তে সরকার নাম ব্যবহার করা হয়। কয়েকটি পরগনা নিয়ে একটি সরকার গড়ে উঠত।
  2. মূলত অনুমানের ভিত্তিতে এসময় প্রত্যেক ‘সরকার’-এর মোট রাজস্ব (জমা) দিল্লির দফতর স্থির করে দিত। এই জমা সরকার হিসেবে বিশিষ্ট অভিজাতদের বন্দোবস্ত দেওয়া হত এবং এরই ভিত্তিতে গ্রহীতার দায়িত্ব ও কর্তব্য স্থির করা হত। সরকারের প্রাপক তাঁর প্রাপ্ত ভূখণ্ড ছোটো ছোটো অংশে ভাগ করে ইজারা বন্দোবস্ত দিতে পারতেন।

সবশেষে, অধ্যাপক আশরাফের মন্তব্যকে দিয়ে আলোচনার পরিসমাপ্তি ঘটানো যায়। তিনি বলেছেন, ‘ক্রমাগত একের পর এক দুর্বল সুলতান সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হওয়ার কারণে ইক্তার অধিকারী নিরবচ্ছিন্নভাবে ইক্তা ভোগদখলের সুযোগ পেত এবং তার ফলে ওই জায়গির প্রায় তার নিজস্ব ব্যক্তিগত সম্পত্তি হয়ে দাঁড়াত।’ ফলস্বরূপ ধীরে ধীরে এই ব্যবস্থা অবসানের পথে এগিয়ে যায়।

৭। অর্থশাস্ত্রের বিষয়বস্তু লেখো

অর্থশাস্ত্রের সংজ্ঞা

প্রাচীন ভারতে রাষ্ট্রতত্ত্ব বিষয়ক গ্রন্থগুলির মধ্যে সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ হল, কৌটিল্য বা চাণক্য রচিত অর্থশাস্ত্র। অর্থশাস্ত্রের সংজ্ঞা নিয়ে আলোচনা করতে গেলে, এই সম্পর্কিত বিভিন্ন ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। কামন্দকের নীতিসার-এ বলা হয়েছে যে, সাফল্যের সঙ্গে রাজ্যের সম্প্রসারণ ও সংরক্ষণ করার জন্য যেসকল কৌশল গ্রহণ করা প্রয়োজন, সেই সকল কৌশল সংবলিত শাস্ত্রই হল অর্থশাস্ত্র। অন্যদিকে শুক্রনীতিসারের ভাষ্য অনুযায়ী জানা যায় যে, সম্পদ সংগ্রহ ও রাজ্যশাসন সম্পর্কিত নির্দেশাবলি রাজাকে প্রদান করা হয়েছে অর্থশাস্ত্র গ্রন্থে। এ ছাড়া কৌটিল্যের কোনও কোনও পূর্বসূরি এমনও বলেছেন যে, প্রকৃতি থেকে প্রাপ্ত জমির সদ্ব্যবহার, সংরক্ষণ এবং মানুষের প্রয়োজনে তা প্রয়োগ করার জন্য যে শাস্ত্র রচনা করা হয়, তাকে বলা হয় অর্থশাস্ত্র।

অর্থশাস্ত্রের ধারণা প্রসঙ্গে কৌটিল্য তন্ত্রযুক্তি (পঞ্চদশ অধিকরণ)-তে উল্লেখ করেছেন- “মনুষ্যের বৃত্তি বা জীবিকাকে ‘অর্থ’ বলা যায়। মনুষ্যযুক্ত ভূমির নামও ‘অর্থ’ হয়। যে শাস্ত্র সেই পৃথিবীর লাভ ও পালনের উপায় নিরূপণ করে, তাহার নাম অর্থশাস্ত্র”F [মনুষ্যনাং বৃত্তিরর্থঃ মনুষ্যবতী ভূমিরিত্যথঃ। তস্যাঃ পৃথিব্যা লাভ পালনোপায়ঃ শাস্ত্রমর্থ শাস্ত্রমিতি।]। অর্থাৎ, কৌটিল্যের মতে, অর্থ হল মানুষের জীবিকানির্বাহের অবলম্বন স্বরূপ একটি বৃত্তি। আবার পৃথিবী, যা মানুষকে ধারণ করে আছে, তা হল সম্পদ বা অর্থ। এই ভূমি বা পৃথিবী অর্জন এবং সংরক্ষণ বিদ্যাই হল অর্থশাস্ত্র। আর পি কাঙ্গলে (RP Kangle) ‘The Kautiliya Arthasastra’ শীর্ষক গ্রন্থে মন্তব্য করেছেন যে- “Arthasastra is the science which is the means of the acquisition and protection of the earth.”

অর্থশাস্ত্রের বিষয়বস্তু

কৌটিল্য তাঁর অর্থশাস্ত্রে ভারতীয় রাষ্ট্রচিন্তাকে একটি সুশৃঙ্খল ও সুসংবদ্ধ রূপ দিয়েছেন। অর্থশাস্ত্রের আলোচনার প্রকৃতিও বস্তুনিষ্ঠ, ধর্মনিরপেক্ষ ও আধুনিক। ১৫টি অধিকরণ ও ১৫০টি অধ্যায়ে বিভক্ত সমগ্র অর্থশাস্ত্রে মোট ১৮০টি প্রকরণ ও ৬ হাজার শ্লোক আছে।  প্রতিটি শ্লোকেই রাষ্ট্রতত্ত্ব ও প্রশাসন পরিচালনার খুঁটিনাটি বিবরণ উপস্থিত। অর্থশাস্ত্রের প্রথম অধ্যায়ের প্রথম অধিকরণে বলা হয়েছে- ‘কৌটিল্যেন কৃতং শাস্ত্রং বিমুক্ত গ্রন্থ বিস্তরম্’, আর গ্রন্থের শেষে বলা হয়েছে ‘শাস্ত্রঞ্চ শাস্ত্রও নন্দরাজগতা চ ভূঃ।’ এই গ্রন্থের বিভিন্ন অধিকরণের বিষয়বস্তুগুলি সম্পর্কে নিম্নে আলোচনা করা হল-

(i) প্রথম অধিকরণ

অর্থশাস্ত্রের প্রথম অধিকরণ বিনয়াধিকারিক (রাজার বিনয় ও বিদ্যাশিক্ষার বিষয় সংবলিত) নামে পরিচিত। এতে মোট ১৮টি প্রকরণ ও ২১টি অধ্যায় আছে। এখানে শাসন পরিচালনায় রাজার দায়িত্ব ও কর্তব্য, রাজ্যের নিরাপত্তা, মন্ত্রী ও গুপ্তচর নিয়োগ প্রভৃতি বিষয়ে আলোচনা স্থান পেয়েছে।

(ii) দ্বিতীয় অধিকরণ

৩৮টি প্রকরণ ও ৩৬টি অধ্যায় নিয়ে গঠিত দ্বিতীয় অধিকরণে জনপদ নির্মাণে রাজার ভূমিকা, শাসনকার্যে অধ্যক্ষদের নিয়োগ, সম্পত্তির সুরক্ষা সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। এর অপর নাম অধ্যক্ষ প্রচার।

(iii) তৃতীয় অধিকরণ

অর্থশাস্ত্রের তৃতীয় অধিকরণটি ধর্মস্বীয় নামে পরিচিত। এতে রয়েছে মোট ১৯টি প্রকরণ ও ২০টি অধ্যায়। দেওয়ানি আদালত বিষয়ক ব্যবহারবিধি, রাষ্ট্রের আইনকানুন ও বিচার সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে বক্তব্য রয়েছে এই অধিকরণে।

(iv) চতুর্থ অধিকরণ

অর্থশাস্ত্রের চতুর্থ অধিকরণ অর্থাৎ, কণ্টকশোধন-এ ফৌজদারি আদালতের মাধ্যমে অপরাধীদের বিচার, রাষ্ট্রবিরোধীদের অপরাধ শনাক্ত করা, রাষ্ট্রের সকল নাগরিকদের বিভিন্ন প্রতিকূলতা থেকে রক্ষা করা প্রভৃতি বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে। তাছাড়া অসৎ বৈদ্য এবং ব্যবসায়ীদের থেকে সাবধান হওয়ার কথাও এতে উল্লিখিত আছে। ১৩টি প্রকরণ ও ১৩টি অধ্যায় চতুর্থ অধিকরণে রয়েছে।

(v) পঞ্চম অধিকরণ

কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রের পঞ্চম অধিকরণটি হল যোগবৃত্ত। এখানে মোট ৭টি প্রকরণ ও ৬টি অধ্যায়ে বিষয়বস্তু বিশ্লেষণ করা হয়েছে। কর্মচারীদের বেতন সংক্রান্ত নিয়মকানুন, দণ্ডবিধি বিষয়ক নীতি প্রবর্তন, গুপ্তহত্যা দ্বারা শত্রুর বিনাশ করা প্রভৃতি বিষয়ে বক্তব্য স্থান পেয়েছে এই অধিকরণে।

(vi) ষষ্ঠ অধিকরণ

যষ্ঠ অধিকরণ অর্থাৎ, মণ্ডলযোনি হল অর্থশাস্ত্রের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ অধিকরণ। এখানে রাষ্ট্রের সপ্তাঙ্গ তত্ত্ব সম্পর্কে আলোকপাত করা হয়েছে। এতে ২টি অধ্যায় ও ২টি প্রকরণ উপস্থিত।

(vii) সপ্তম অধিকরণ

২৯টি প্রকরণ ও ১৮টি অধ্যায় নিয়ে গঠিত ষাড়গুণ বা ষাড়গুণ্য নামে পরিচিত সপ্তম অধিকরণে মূলত পরাক্রান্ত রাজার শত্রুদের সঙ্গে যুদ্ধে জয়লাভের পদ্ধতি, সন্ধির মাধ্যমে প্রতিবেশী রাজ্যগুলির সঙ্গে রাজার সম্পর্ক স্থাপন প্রভৃতি বিষয়বস্তু স্থান পেয়েছে। সন্ধি, বিগ্রহ, আসন, যান, সংশ্রয় ও দ্বৈধীভাব-এগুলিই হল ষাড়গুণ্য বা ছয়টি গুণ।

(viii) অষ্টম অধিকরণ

অর্থশাস্ত্রের অষ্টম অধিকরণ অর্থাৎ, ব্যসনাধিকারিক-এর মূল আলোচ্য বিষয় হিসেবে অপরাধীদের দ্বারা সৃষ্ট বিপদ, অসৎ ব্যক্তিদের শনাক্ত করা ও তাদের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য স্থান লাভ করেছে। অষ্টম অধিকরণে ৮টি প্রকরণ ও ৫টি অধ্যায় রয়েছে।

(ix) নবম অধিকরণ

নবম অধিকরণ অর্থাৎ, অভিযাস্যৎকর্ম ১২টি প্রকরণ ও ৭টি অধ্যায় নিয়ে গঠিত। এতে যুদ্ধ এবং সামরিক অভিযানে উদ্যোগী রাজাদের কর্তব্য সম্পর্কিত আলোচনা করা হয়েছে।

(x) দশম অধিকরণ

দশম অধিকরণ বা সাংগ্রামিক-এ যুদ্ধের প্রস্তুতিপর্ব, সৈন্যবাহিনী গঠন প্রভৃতি বিষয় আলোচিত হয়েছে। এতে মোট ১৩টি প্রকরণ ও ৬টি অধ্যায় রয়েছে।

(xi) একাদশ অধিকরণ

একাদশ অধিকরণটি পরিচিত সংঘবৃত্ত নামে। এখানে মোট প্রকরণের সংখ্যা ২টি, অধ্যায়ের সংখ্যা ১টি। এই অধিকরণে রাজার আচরণবিধি এবং অভিজাততান্ত্রিক রাষ্ট্র, সংঘ ও নিগম সম্পর্কিত নীতি বিষয়ে উল্লেখ আছে।

(xii) দ্বাদশ অধিকরণ

আবলীয়স নামে পরিচিত দ্বাদশ অধিকরণে দুর্বল রাজা কীভাবে বিপদমুক্ত হবেন, সেই সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। এই অধিকরণে ৯টি প্রকরণ ও ৫টি অধ্যায় উপস্থিত।

(xiii) ত্রয়োদশ অধিকরণ

ত্রয়োদশ অধিকরণ বা দুর্গলম্ভোপায়-এ শত্রুবাহিনীর দুর্গ দখল সংক্রান্ত উপায় সম্পর্কে আলোচনা স্থান পেয়েছে। এখানে প্রকরণ ৬টি ও ৫টি অধ্যায় রয়েছে।

(xiv) চতুর্দশ অধিকরণ

ঔপনিষদিক বা চতুর্দশ অধিকরণে মন্ত্র, ঔষধি ও বশীকরণ দ্বারা শত্রুরাজ্য দখলের উপায় বর্ণিত হয়েছে। উক্ত অধিকরণে ৩টি প্রকরণ ও ৪টি অধ্যায় উপস্থিত।

(xv) পঞ্চদশ অধিকরণ

তন্ত্রযুক্তি নামক পঞ্চদশ এই অধিকরণে কৌটিল্যের পরিচয় ও ‘অর্থশাস্ত্র’ নামকরণের ব্যাখ্যা আলোচিত হয়েছে। সর্বশেষ এই অধিকরণটিতে ১টি প্রকরণ ও ১টি অধ্যায় রয়েছে।

আরও পড়ুন – ১। প্লেটোর আদর্শ রাষ্ট্রের সীমাবদ্ধতাগুলি সংক্ষেপে আলোচনা করো

২। প্লেটোর সাম্যবাদী তত্ত্বের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে আলোচনা করো

৩। রাষ্ট্রচিন্তার জগতে প্লেটোর অবদান সংক্ষেপে আলোচনা করো

৪। অ্যারিস্টটলের ধারণায় রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্যগুলি কী কী ছিল

৫। সরকারের শ্রেণিবিভাজন সম্পর্কে অ্যারিস্টটলের অভিমত আলোচনা করো

৬। রাষ্ট্রচিন্তার বিকাশে অ্যারিস্টটলের অবদান সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করো

৭। গ্রিক রাষ্ট্রচিন্তার গুরুত্ব আলোচনা করো

৮। এপিকিউরীয় ও সিনিক রাষ্ট্রদর্শনের বৈশিষ্ট্য সংক্ষেপে আলোচনা করো

৯। টাকা লেখো- দ্বাদশ সারণী

১০। রোমান আইনতত্ত্ব সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করো

১১। রাষ্ট্রচিন্তাবিদ পলিবিয়াসের সংক্ষিপ্ত পরিচয় দাও

১২। সিসেরোর পরিচয় সংক্ষেপে আলোচনা করো

১৩। আদর্শ রাষ্ট্র ও সাম্যনীতি প্রসঙ্গে সিসেরোর অভিমত উল্লেখ করো

১৪। রাষ্ট্রে ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা সম্পর্কে সিসেরোর অভিমত সংক্ষেপে আলোচনা করো

আরও পড়ুন প্রয়োজনে
বিপ্লবী আদর্শ নেপোলিয়নীয় সাম্রাজ্য ও জাতীয়তাবাদ প্রশ্ন উত্তর ক্লাস নাইন ইতিহাস | Class 9 History 2nd Chapter Question Answer Click here
নবম শ্রেণি ইতিহাস সাজেশন ২০২৬ | Class 9 History Suggestion 2026 Click here
দশম শ্রেণি ইতিহাস প্রথম অধ্যায় ইতিহাসের ধারণা প্রশ্ন উত্তর | Class 10 History First Chapter Question Answer Click here
Madhyamik History Suggestion 2025-2026 Click here

Leave a Comment