বিপ্লবী আদর্শ নেপোলিয়নীয় সাম্রাজ্য ও জাতীয়তাবাদ প্রশ্ন উত্তর ক্লাস নাইন ইতিহাস | Class 9 History 2nd Chapter Question Answer

Table of Contents

বিপ্লবী আদর্শ নেপোলিয়নীয় সাম্রাজ্য ও জাতীয়তাবাদ প্রশ্ন উত্তর ক্লাস নাইন ইতিহাস | Class 9 History 2nd Chapter Question Answer

বিপ্লবী আদর্শ নেপোলিয়নীয় সাম্রাজ্য ও জাতীয়তাবাদ প্রশ্ন উত্তর
বিপ্লবী আদর্শ নেপোলিয়নীয় সাম্রাজ্য ও জাতীয়তাবাদ প্রশ্ন উত্তর

[প্রশ্নমান 8]

1. নেপোলিয়নের বিভিন্ন সংস্কারগুলি উল্লেখ করো।

ফরাসি শাসক নেপোলিয়ন শুধু সমরকুশলী যোদ্ধা হিসেবেই নয়, সুদক্ষ সংস্কারক হিসেবেও কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছেন। ঐতিহাসিক ফিশার বলেছেন যে, “নেপোলিয়নের সাম্রাজ্য ক্ষণস্থায়ী হলেও ফ্রান্সে তাঁর অসামরিক সংস্কারগুলি গ্রানাইট পাথরের শক্ত ভিতের ওপর নির্মিত হয়েছিল।”

নেপোলিয়নের সংস্কার

নেপোলিয়নের প্রধান সংস্কারগুলি হল-

[1] শাসনতান্ত্রিক সংস্কার: নেপোলিয়ন ফ্রান্সে আইনের শাসন প্রবর্তন করেন এবং জনগণের জীবন ও সম্পত্তির নিরাপত্তা দেন। সমগ্র দেশকে ৮৩টি ডিপার্টমেন্ট বা প্রদেশে বিভক্ত করে সেখানে ‘প্রিফেক্ট’ নামে শাসক নিয়োগ করেন। তিনি প্রদেশগুলিকে বিভিন্ন জেলায় বিভক্ত করে সেখানে ‘সাব-প্রিফেক্ট’ নামে শাসক নিয়োগ করেন।

[2] অর্থনৈতিক সংস্কার: দেশের অর্থনৈতিক সংকট দূর করার উদ্দেশ্যে নেপোলিয়ন বিভিন্ন পদক্ষেপ নেন। তিনি [i] সরকারি ব্যয় হ্রাস ও অডিট প্রথা চালু করেন, (ii) সবাইকে আয়কর প্রদানে বাধ্য করেন, [iii] নতুন কর না চাপিয়ে পুরোনো কর আদায়ে জোর দেন, [iv] ‘ব্যাংক অব ফ্রান্স’ প্রতিষ্ঠা (১৮০০ খ্রি.) করেন) ও [v] বাণিজ্যের উন্নতির জন্য বণিক সংঘের পুনর্গঠন করেন।

[3] শিক্ষা সংস্কার: নেপোলিয়ন- ফ্রান্সে বেশ কিছু মাধ্যমিক, ফলিত বিজ্ঞান, চিকিৎসা, কারিগরি, আইন, শিক্ষক-শিক্ষণ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন, [ii] ২৯টি ‘লাইসি’ বা আবাসিক বিদ্যালয় স্থাপন করেন, [iii] ‘ইউনিভার্সিটি অব ফ্রান্স’ প্রতিষ্ঠা করেন (১৮০৮ খ্রি.)।

[4] ধর্মীয় সংস্কার: নেপোলিয়ন পোপ সপ্তম পায়াস-এর সঙ্গে ‘কনকর্ডাট’ বা ‘ধর্ম-মীমাংসা চুক্তি’ (১৮০১ খ্রি.) স্বাক্ষর করে পোপের সঙ্গে বিরোধ মিটিয়ে নেন। এই চুক্তির দ্বারা- পোপ ফরাসি গির্জা ও গির্জার সম্পত্তির জাতীয়করণ মেনে নেন, ফ্রান্স রোমান ক্যাথোলিক ধর্মমত ও গির্জাকে স্বীকৃতি দেয় এবং [iii] স্থির হয় যে, সরকার যাজকদের নিয়োগ করবে এবং পোপ তাদের স্বীকৃতি দেবে।

[5] আইনবিষয়ক সংস্কার: নেপোলিয়ন বিভিন্ন প্রদেশে প্রচলিত বিভিন্ন ধরনের আইনগুলির মধ্যে সামঞ্জস্য আনতে ১৮০৪ খ্রিস্টাব্দে ২২৮৭টি (মতান্তরে ২২৮১টি) বিধি-সম্বলিত ‘কোড নেপোলিয়ন’ নামে এক আইনসংহিতা প্রবর্তন করেন। এর প্রধান দিকগুলি ছিল-[i] সামন্ততন্ত্রের বিলুপ্তি, [ii] ব্যক্তিস্বাধীনতা ও সম্পত্তির অধিকারের স্বীকৃতি, [iii] আইনের দৃষ্টিতে সাম্য, [iv] ধর্মীয় সহনশীলতা, [v] সরকারি চাকরিতে যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগ প্রভৃতি।

মূল্যায়ন: নেপোলিয়ন তাঁর সংস্কার কার্যাবলির দ্বারা বিপ্লব-বিধ্বস্ত ফ্রান্সে শান্তি ও সমৃদ্ধি ফিরিয়ে আনেন। ঐতিহাসিক ডেভিড টমসন বলেছেন যে, নেপোলিয়নের শাসন শুধু প্রজাহিতৈষীই ছিল না-তা বর্তমানকালের একনায়কতন্ত্রের তুলনায় অনেক বেশি মানবিক ছিল।

2. নেপোলিয়নের পতনের কারণগুলি নিয়ে আলোচনা করো।

১৭৯৯ থেকে ১৮১৪ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত নেপোলিয়ন ছিলেন ইউরোপের ভাগ্যনিয়ন্তা। কিন্তু নিয়তির পরিহাসে একসময় তাঁরও পতন ঘটে। ১৮০৭ খ্রিস্টাব্দে টিলসিটের সন্ধি স্বাক্ষরের পর থেকেই নেপোলিয়নের পতন ক্রমশ ঘনিয়ে আসে।

নেপোলিয়নের পতনের কারণ

১৮১৫ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ সেনাপতি আর্থার ওয়েলেসলির কাছে ওয়াটারলু-এর যুদ্ধে তাঁর চূড়ান্ত পরাজয় ও পতন ঘটে। তাঁর পতনের বিভিন্ন কারণ ছিল-

[1] সীমাহীন উচ্চাকাঙ্ক্ষা : নেপোলিয়নের উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছিল সীমাহীন। তিনি নিজেকে অপরাজেয় বলে মনে করতেন এবং তাঁর সামরিক বাহিনীর কার্যকারিতা সম্পর্কে সীমাহীন উচ্চাকাঙ্ক্ষা পোষণ করতেন) তার ফলে তিনি ইউরোপের বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে অন্ধ হয়ে একই সঙ্গে বিভিন্ন শক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন।

[2] সাম্রাজ্যের দুর্বল ভিত্তি : নেপোলিয়নের সাম্রাজ্যের ভিত্তি ছিল দুর্বল। সামরিক শক্তির জোরে প্রতিষ্ঠিত এই সাম্রাজ্যের প্রতি জনগণের আন্তরিক সমর্থন ছিল না। তিনি যুদ্ধের মাধ্যমে যেসব জাতিকে ফ্রান্সের অন্তর্ভুক্ত করেন সেসব জাতি নেপোলিয়ন ও ফরাসি শাসনকে অত্যন্ত ঘৃণার চোখে দেখত।

[3] স্বৈরতন্ত্র: নেপোলিয়ন ইউরোপের জনগণকে বংশানুক্রমিক স্বৈরাচারী শাসকদের হাত থেকে মুক্তির আশ্বাস দিলেও পরবর্তীকালে তিনি নিজেই সেসব দেশে সীমাহীন স্বৈরতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি বাস্তবে ফ্রান্সকে একটি পুলিশি রাষ্ট্রে পরিণত করেন। ফলে তাঁর বিরুদ্ধে তীব্র জনমত গড়ে ওঠে।

[4] সাম্রাজ্যের বিশালতা: নেপোলিয়নের সুবিশাল সাম্রাজ্যে নিজের কর্তৃত্ব স্থায়ী করার জন্য যে সংগঠন গড়ে তোলা দরকার ছিল সেদিকে নেপোলিয়ন বিশেষ নজর দেননি। ফলে বিশাল সাম্রাজ্যের ওপর তাঁর নিয়ন্ত্রণ ক্রমে শিথিল হয়ে যায় এবং সাম্রাজ্যের বিশালতা তাঁর পতনের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

[5] স্পেনীয় ক্ষত: নেপোলিয়ন স্পেন দখল করে সেখানকার সিংহাসনে নিজের ভাই জোসেফকে বসিয়ে দেন। ফলে স্পেনের জাতীয়তাবাদী ও দেশপ্রেমিক সাধারণ মানুষ নেপোলিয়নের বিরুদ্ধে তীব্র মুক্তিযুদ্ধ শুরু করে। এই যুদ্ধে নেপোলিয়নের ব্যাপক বিপর্যয় ঘটে।

[6] পোপের সঙ্গে বিরোধ: নেপোলিয়ন মহাদেশীয় অবরোধ কার্যকর করতে গিয়ে রোমের শাসক পোপকে বন্দি করে তাঁর রাজ্য দখল করলে ইউরোপের ক্যাথোলিক ধর্মাবলম্বীরা নেপোলিয়নের ওপর প্রবল ক্ষুব্ধ হয়।

[7] মস্কো অভিযান: রাশিয়া মহাদেশীয় অবরোধ প্রথা মানতে অস্বীকার করলে নেপোলিয়ন রাশিয়া আক্রমণ (১৮১২ খ্রি.) করেন। সেখানে তাঁর ‘মহান সেনাদলের’ বেশিরভাগ সৈন্য তীব্র শীত, খাদ্য ও পানীয় জলের অভাব, মহামারি ও রুশ গেরিলা সৈন্যের আক্রমণে মারা যায়।

[৪] ইংল্যান্ডের নৌশক্তি: ট্রাফালগার ও নীলনদের নৌযুদ্ধে ইংল্যান্ড ফরাসি নৌবহরের যে ক্ষতি করে তা ফ্রান্স আর পুনরুদ্ধার করতে পারেনি। পরবর্তীকালে স্পেন ও পোর্তুগালের পক্ষে শক্তিশালী ইংল্যান্ড যোগ দিলে নেপোলিয়নের পতন অনিবার্য হয়ে পড়ে।

[9] মহাদেশীয় অবরোধে ব্যর্থতা: নেপোলিয়ন ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে মহাদেশীয় অবরোধ জারি করলেও শক্তিশালী নৌবাহিনীর অভাবে তিনি তা কার্যকরী করতে পারেননি। বলপ্রয়োগ করে অবরোধ কার্যকর করতে গিয়ে তিনি একসঙ্গে বিভিন্ন দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন। অন্যদিকে, নেপোলিয়নের অবরোধের পালটা অস্ত্র হিসেবে ফ্রান্সের বিরুদ্ধে ইংল্যান্ড ‘অর্ডার্স-ইন-কাউন্সিল’ নামে অবরোধ জারি করলে ফ্রান্সের যথেষ্ট ক্ষতি হয়।

[10] শক্তিজোট গঠন: ইংল্যান্ড, রাশিয়া, অস্ট্রিয়া ও প্রাশিয়া- ইউরোপের এই চারটি বৃহৎ শক্তি নেপোলিয়নের বিরুদ্ধে শক্তিজোট গঠন করলে তাঁর পতন অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়ে। চতুর্থ শক্তিজোট ওয়াটারলু-এর যুদ্ধে (১৮১৫ খ্রি.) নেপোলিয়নকে পরাজিত করলে তাঁর পতন ঘটে।

মূল্যায়ন: ওয়াটারলু-এর যুদ্ধে পরাজয়ের পর নেপোলিয়নকে সিংহাসনচ্যুত করে ফ্রান্স থেকে প্রায় ৫ হাজার মাইল দূরে আটলান্টিক মহাসাগরের গভীরে সেন্ট হেলেনা দ্বীপে নির্বাসনে পাঠানো হয়। সেখানে ১৮২১ খ্রিস্টাব্দে ১৫ মে মাত্র ৫২ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়।

3. নেপোলিয়নের পতনে মহাদেশীয় অবরোধের কী ভূমিকা ছিল?

ফরাসি সম্রাট নেপোলিয়ন ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে মহাদেশীয় অবরোধ জারি করে ইংল্যান্ডের অর্থনীতি ধ্বংস করার পরিকল্পনা করেন।

নেপোলিয়নের পতনে মহাদেশীয় অবরোধের ভূমিকা

নেপোলিয়ন মহাদেশীয় অবরোধ ব্যবস্থা বলপ্রয়োগের দ্বারা কার্যকর করতে গিয়ে বিভিন্ন সংকটে জড়িয়ে পড়েন যা তাঁর পতনকে অবশ্যম্ভাবী করে তোলে। যেমন-

[1] ফ্রান্সের অর্থনৈতিক ক্ষতি: নেপোলিয়নের মহাদেশীয় অবরোধ ব্যবস্থা পরোক্ষে ফ্রান্সের অর্থনীতিরই যথেষ্ট ক্ষতি করে। ইংল্যান্ডের ‘অর্ডার্স-ইন-কাউন্সিল’ নামে নৌ-প্রতিরোধের ফলে ফ্রান্সের সামুদ্রিক বাণিজ্য যথেষ্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে ফ্রান্সে শ্রমিক ছাঁটাই, বেকার সমস্যা প্রভৃতি ভয়াবহ আকার ধারণ করে। তাই ঐতিহাসিক জর্জ রুডে বলেছেন যে, “মহাদেশীয় ব্যবস্থা ফ্রান্সের পক্ষে ‘বুমেরাং’ হয়ে দাঁড়ায়।”

[2] উপকূল দখল: নেপোলিয়ন জোর করে মহাদেশীয় অবরোধ প্রথা কার্যকর করতে গিয়ে ইউরোপের উপকূল অঞ্চলের প্রায় ২ হাজার মাইল অঞ্চল দখল করে নেন। এ ছাড়া বহু নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ দেশ তিনি দখল করে নিলে বিভিন্ন দেশে তাঁর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ শুরু হয়।

[3] ব্যয়ভার: মহাদেশীয় ব্যবস্থা কার্যকর করতে গিয়ে নেপোলিয়ন যে বিস্তৃত ভূখণ্ড দখল করেন সেখানে প্রত্যক্ষ দখলদারি চালাতে গিয়ে তাঁকে সামরিক বাহিনীসহ সর্বত্র ছুটে বেড়াতে হয়। ফলে ফরাসি সেনাদল অত্যন্ত চাপে থাকে এবং বিপুল সম্পদ ব্যয় হয়।

[4] রোম ও হল্যান্ডে অসন্তোষ: রোম ও হল্যান্ড মহাদেশীয় ব্যবস্থা মানতে অস্বীকার করায় নেপোলিয়ন সেখানে হস্তক্ষেপ করেন। [i] তিনি রোমের শাসক পোপকে সিংহাসনচ্যুত করে তাঁকে বন্দি করলে খ্রিস্টান ক্যাথোলিক জগত প্রচণ্ড ক্ষুদ্ধ হয়। [ii] হল্যান্ডের শাসক লুই (নেপোলিয়নের ভাই)-কে সিংহাসনচ্যুত করে হল্যান্ড দখল করেন।

[5] উপদ্বীপের যুদ্ধে বিপর্যয়: [i] পোর্তুগাল মহাদেশীয় ব্যবস্থা মানতে অস্বীকার করায় নেপোলিয়ন স্পেনের অনুমতি না নিয়ে স্পেনের ওপর দিয়ে পোর্তুগালে সেনা পাঠিয়ে সেখানে মহাদেশীয় ব্যবস্থা কার্যকর করেন। [ii] পোর্তুগাল থেকে ফেরার পথে তিনি স্পেন দখল করে সেখানকার সিংহাসনে নিজের ভাই জোসেফকে বসান। এর ফলে স্পেন ও পোর্তুগাল নেপোলিয়নের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে যা উপদ্বীপের যুদ্ধ (১৮০৮-১৪ খ্রি.) নামে পরিচিত। এই যুদ্ধে ইংল্যান্ডও স্পেনের পক্ষে যোগ দিলে ফ্রান্সের পরাজয় ঘটে।

[6] রাশিয়ায় বিপর্যয়: রাশিয়া মহাদেশীয় ব্যবস্থা মানতে অস্বীকার করায় নেপোলিয়ন রাশিয়া আক্রমণ (১৮১২ খ্রি.) করেন। কিন্তু রাশিয়ায় তাঁর ‘গ্রাঁদ আর্মি’ চূড়ান্তভাবে পরাজিত হয় এবং তাঁর বেশিরভাগ সৈন্য মারা যায়।

মূল্যায়ন: ইংল্যান্ডের অর্থনৈতিক শক্তি ধ্বংস করতে গিয়ে নেপোলিয়ন চতুর্দিকে অসংখ্য শত্রু তৈরি করে ফেলেন এবং শেষপর্যন্ত শত্রুদের কাঁটার জালে তিনি নিজেই আটকে পড়েন। তাই বলা যায় যে, নেপোলিয়নের পতনের অন্যতম কারণ ছিল মহাদেশীয় অবরোধ ব্যবস্থা। ঐতিহাসিক লজ বলেছেন যে, “মহাদেশীয় ব্যবস্থা ছিল একজন রাজনীতিবিদ হিসেবে নেপোলিয়নের অযোগ্যতার সবচেয়ে বড়ো প্রমাণ।”

[প্রশ্নমান 8]

1. নেপোলিয়ন কীভাবে ফ্রান্সের ক্ষমতা লাভ করেন?

আধুনিক ইউরোপ তথা বিশ্বের ইতিহাসে নেপোলিয়ন বোনাপার্ট ছিলেন এক গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রনায়ক যিনি এক সাধারণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেও নিজ প্রতিভার গুণে ফ্রান্সের চূড়ান্ত শাসনক্ষমতা দখল করেন। ঐতিহাসিক ফিলিপ গুয়েদালা বলেছেন যে, “নেপোলিয়নের উত্থানের ফলে ফ্রান্সের ইতিহাস হয় ইউরোপের ইতিহাস এবং নেপোলিয়নের ইতিহাস হয় ফ্রান্সের ইতিহাস”।

নেপোলিয়নের উত্থান ও ক্ষমতালাড

[1] উত্থান: ফরাসি বিপ্লবের ঘটনা নেপোলিয়নের উত্থানের ভিত গড়ে দেয়। এই বিপ্লবই তাঁকে জীবন পথের সন্ধান দেয়। তিনি বিপ্লবপন্থী জ্যাকোবিন দলের সঙ্গে যুক্ত থেকে নিজেকে ইতিহাসের পাদপ্রদীপের সামনে তুলে ধরেন। বিপ্লবের পর নেপোলিয়ন মাত্র ১৭বছর বয়সে ফরাসি গোলন্দাজ বাহিনীর লেফটেন্যান্ট পদে নিযুক্ত হন।

[2] অভ্যন্তরীণ সাফল্য: লেফটেন্যান্ট পদে বসে নেপোলিয়ন ফ্রান্সের অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য পান। এই সময়-[i] ইংরেজ বাহিনীর অবরোধ থেকে ফ্রান্সের তুলো বন্দর মুক্ত (১৭৯৩ খ্রি.) করে সামরিক সাফল্য দেখিয়ে তিনি ব্রিগেডিয়ার জেনারেলের পদে উন্নীত হন। [ii] তিনি উন্মত্ত জনতার আক্রমণ থেকে ফরাসি জাতীয় সভাকে রক্ষা করেন (১৭৯৫ খ্রি.) এটি ‘ভঁদেমিয়ার ঘটনা’ নামে পরিচিত। এই সাফল্যের পুরস্কারস্বরূপ তিনি মেজর জেনারেল পদ লাভ করেন।

[3] সামরিক সাফল্য: ডাইরেক্টরির শাসনকালে (১৭৯৫-৯৯ খ্রি.) নেপোলিয়ন [i] ইটালির সার্ডিনিয়া, পার্মা, মডেনা ও নেপলসকে পরাজিত করেন। [ii] অস্ট্রিয়াকে পরাজিত করে মিলান-সহ ইটালির বিভিন্ন স্থান ফ্রান্সের দখলে আনেন এবং পরে অস্ট্রিয়াকে ক্যাম্পো-ফর্মিও-এর সন্ধি (১৭৯৭ খ্রি.) স্বাক্ষরে বাধ্য নেপোলিয়ন বোনাপার্ট করেন। [iii] পোপের রাজ্য আক্রমণ করে পোপকে টলেন্টিনা-র সন্ধি (১৭৯৭ খ্রি.) স্বাক্ষরে বাধ্য করেন। [iv] ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে পিরামিডের যুদ্ধে (১৭৯৮ খ্রি.) জয়লাভ করলেও নীলনদের যুদ্ধে (১৭৯৮ খ্রি.) পরাজিত হন।

[4] ক্ষমতা দখল: ডাইরেক্টরির শাসনকালে ফ্রান্সে চরম বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। ফলে এই শাসনব্যবস্থার প্রতি ফরাসি জনগণ অসন্তুষ্ট হয়ে ওঠেন। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে নেপোলিয়ন সেনাবাহিনীর সহায়তায় ডাইরেক্টরির শাসকদের পদচ্যুত করে (৯ নভেম্বর, ১৭৯৯ খ্রি.) ফ্রান্সে ‘কনসুলেট’ নামে এক নতুন শাসনব্যবস্থা চালু করেন। তিনি নিজে প্রধান কনসালের দায়িত্ব নেন এবং আরও ২ জন সহযোগী কনসাল নিয়োগ করে শাসন চালাতে থাকেন।

[5] চূড়ান্ত ক্ষমতা: নেপোলিয়ন প্রথমে ১০ বছরের জন্য এবং পরে সংবিধান সংশোধন করে ১৮০২ খ্রিস্টাব্দে আজীবন কনসাল পদ লাভকরেন। ফলে ফরাসি শাসনব্যবস্থায় তাঁর শক্তি অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠে। এই অবস্থায় তিনি ১৮০৪ খ্রিস্টাব্দে ‘সম্রাট’ উপাধি গ্রহণ করেন এবং মাত্র ৩০ বছর বয়সে ফ্রান্সে বংশানুক্রমিক রাজতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা করেন।

মূল্যায়ন: ফরাসি বিপ্লবের সাম্য-মৈত্রী-স্বাধীনতার আদর্শকে জনগণের সামনে তুলে ধরে নেপোলিয়ন ক্ষমতা হস্তগত করলেও পরবর্তীকালে তিনি জনগণের স্বাধীনতার অধিকারটি ধূলিসাৎ করেন। অবশ্য জনগণকে সাম্য ও মৈত্রীর অধিকার দিয়ে তিনি দেশবাসীর ক্ষতি কিছুটা পূরণ করার চেষ্টা করেন। তিনি দেশে চূড়ান্ত স্বৈরতান্ত্রিক রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করলেও তাঁর শাসনতান্ত্রিক সংস্কার ও সামরিক সাফল্যে দেশবাসী মুগ্ধ হয়ে তাঁর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ থেকে বিরত ছিল।

2. কোড নেপোলিয়ন’ সম্পর্কে কী জান? অথবা, টীকা লেখো: কোড নেপোলিয়ন।

কোড নেপোলিয়ন

নেপোলিয়নের সর্বাপেক্ষা গৌরবময় কীর্তি হল ‘কোড নেপোলিয়ন’ প্রবর্তন।

আইনসমূহ রচনা: নেপোলিয়নের উদ্যোগে গঠিত কমিশন ১৮০৪ খ্রিস্টাব্দে ফ্রান্সের জন্য নতুন আইনসমূহ রচনা করেন। এটি ‘কোড নেপোলিয়ন’ (Code Napoleon) বা ‘নেপোলিয়নের আইনসংহিতা’ নামে পরিচিত।

আইনসমূহের শ্রেণিবিভাগ: কোড নেপোলিয়নে মোট ২২৮৭টি (মতান্তরে ২২৮১টি) আইন ছিল। এর আইনগুলি মূলত তিনভাগে বিভক্ত ছিল, যথা দেওয়ানি আইন, [i]’ ফৌজদারি আইন এবং [ii) বাণিজ্যিক আইন।

বৈশিষ্ট্য: কোড নেপোলিয়নের দ্বারা আইনের চোখে দেশের সকল নাগরিকের মধ্যে সাম্য প্রতিষ্ঠা করা হয়, [ii] সামন্ততান্ত্রিক অসাম্যের বিলোপ ঘটানো হয়, [iii] যোগ্যতার ভিত্তিতে সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ব্যবস্থা করা হয়, [iv] ব্যক্তিস্বাধীনতার স্বীকৃতি দেওয়া হয়, সম্পত্তির অধিকারকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়, [vi] ধর্মীয় সহনশীলতার নীতি গ্রহণ করা হয় এবং [vii] অপরাধের শাস্তি হিসেবে জরিমানা, কারাদণ্ড, সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত, মৃত্যুদণ্ড প্রভৃতির ব্যবস্থা করা হয়।

ত্রুটি: কোড নেপোলিয়নের বিভিন্ন ত্রুটি ছিল। যেমন র্য সমাজে নারীর মর্যাদা হ্রাস করা হয়, (ঘ) স্ত্রীর ওপর স্বামীর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়, [iii] পারিবারিক সম্পত্তির অধিকার থেকে নারীকে বঞ্চিত করা হয় এবং [v] শ্রমিকশ্রেণি তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়।

উপসংহার: কোড নেপোলিয়ন প্রবর্তনের মাধ্যমে নেপোলিয়ন ফ্রান্সের বিপ্লবপ্রসূত ভাবধারাগুলিকে আইনি স্বীকৃতি দেন। অবশ্য এই আইনসংহিতার কিছু ত্রুটিবিচ্যুতি থেকেই গিয়েছিল।

3. নেপোলিয়নের ইউরোপ পুনর্গঠনের সংক্ষিপ্ত বিবরণ দাও।

১৭৯৯ খ্রিস্টাব্দে ফ্রান্সের শাসনক্ষমতা দখল করার আগেই সেনাপতি নেপোলিয়ন ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে অভিযান শুরু করেন। রাশিয়ার সঙ্গে টিলসিটের সন্ধির (১৮০৭ খ্রি.) দ্বারা ফরাসি সম্রাট নেপোলিয়নের সাম্রাজ্য সর্বোচ্চ সীমায় উপনীত হয়।

নেপোলিয়ন কর্তৃক ইউরোপের পুনর্গঠন

নেপোলিয়ন সাম্রাজ্যের প্রসার ঘটানোর পাশাপাশি ইউরোপের পুনর্গঠনে নজর দেন। তার পুনর্গঠন কার্যের সর্বাধিক প্রভাব পড়ে ইটালি ও জার্মানিতে।

[1] পুনর্গঠনের নীতি: নেপোলিয়ন অধিকৃত ভূখণ্ডগুলি নিয়ে ফ্রান্সের চারপাশে বিভিন্ন নতুন রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। প্রথমে এসব স্থানে ‘সিজালপাইন’, ‘বাটাভিয়া’ প্রভৃতি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করলেও ১৮০৪ খ্রিস্টাব্দে তিনি ‘সম্রাট’ উপাধি গ্রহণ করার পর সেগুলিতে রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয় এবং সেসব রাজ্যের সিংহাসনে নিজের ভাই, পুত্র ও নিকট আত্মীয়দের বসিয়ে দেন।

[2] ইটালির পুনর্গঠন: নেপোলিয়ন ইটালি থেকে অস্ট্রিয়াকে বিতাড়িত করে ইটালির মানচিত্রে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটান। [i] তিনি ইটালিতে ‘সিজালপাইন’ ও ‘বাটাভিয়া’ রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে সেখানে প্রথমে প্রজাতন্ত্র ও পরবর্তীকালে রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন। [ii] ইটালির জেনোয়া, টাসকানি ও পার্মা ফরাসি সাম্রাজ্যভুক্ত হয়। [iii] রোমের পোপের রাজ্য ফ্রান্সের একটি প্রদেশে পরিণত করা হয়। [iv] দক্ষিণ ইটালিতে নেপল্স রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে নেপোলিয়ন সেখানকার সিংহাসনে নিজের ভাই জোসেফকে বসান।

[3] জার্মানির পুনর্গঠন: জার্মানিতে প্রায় ৩০০টি ছোটো ও দুর্বল রাজ্যের অস্তিত্ব ছিল। নেপোলিয়ন এই রাজ্যগুলি ভেঙে জার্মানিতে ৩৯টি রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। রাজ্যগুলি নিয়ে- [i] ‘কনফেডারেশন অব দ্য রাইন’, [ii] ‘কিংডম অব ওয়েস্টফেলিয়া’ এবং [iii] ‘গ্র্যান্ড ডাচি অব ওয়ারশ’ নামে তিনটি রাজ্যমণ্ডল গঠন করা হয়।

উপসংহার: নেপোলিয়ন কর্তৃক ইউরোপের পুনর্গঠনের ফলে ইউরোপের মানচিত্রে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে। ইতালি ও জার্মানি পুনর্গঠনের মধ্য দিয়ে তারা রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতা থেকে মুক্তি পায় এবং তাদের ভবিষ্যত ঐক্যের ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়।

4. নেপোলিয়নের মহাদেশীয় অবরোধ ব্যর্থ হয়েছিল কেন?

ফরাসি সম্রাট নেপোলিয়ন ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে অবরোধ ঘোষণা করে ইংল্যান্ডের অর্থনৈতিক শক্তি ভেঙে দেওয়ার উদ্যোগ নিলেও তার উদ্দেশ্য সফল হয়নি।

মহাদেশীয় অবরোধ ব্যর্থ হওয়ার কারণ

নেপোলিয়নের মহাদেশীয় অবরোধ ব্যর্থ হওয়ার কারণগুলি ছিল-

[1] ফরাসি নৌশক্তির অভাব: নেপোলিয়ন ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক অবরোধ ঘোষণা করলেও ইউরোপের সুবিস্তৃত উপকূল অঞ্চলে নজরদারি করে তা বাস্তবায়িত করার মতো পর্যাপ্ত নৌশক্তি ‘ফ্রান্সের ছিল না। ফলে ইউরোপে ব্রিটিশ পণ্যের প্রবেশ আটকাতে নেপোলিয়ন ব্যর্থ হন।

[2] ইংল্যান্ডের শক্তিশালী নৌবহর: ফ্রান্সের বিরুদ্ধে ইংল্যান্ড ‘অর্ডার্স-ইন-কাউন্সিল’ নামে পালটা যে অবরোধ ঘোষণা করে তা ইংল্যান্ড তার শক্তিশালী নৌবহরের সাহায্যে বাস্তবায়িত করতে সক্ষম হয়।

[3] ব্রিটিশ পণ্যের চাহিদা: ইউরোপের বাজারে উন্নতমানের বস্ত্র, চা, কফি, চিনি প্রভৃতি ব্রিটিশ শিল্পজাত সামগ্রীর খুবই চাহিদা ছিল। শিল্পে অনুন্নত ফ্রান্সের পক্ষে নিম্নমানের ও বেশি দামের পণ্য বিক্রি করে ব্রিটিশ পণ্যের চাহিদা ধ্বংস করা সম্ভব ছিল না।

[4] ফ্রান্সে ব্রিটিশ পণ্যের আমদানি: ফরাসি শিল্পজাত পণ্য নিম্নমানের হওয়ায় স্বয়ং ফ্রান্সকেই গোপনে ব্রিটিশ পণ্যের ওপর নির্ভর করতে হত। ফরাসি চোরাকারবারিরা গোপনে ব্রিটিশ পণ্য ফ্রান্সে আমদানি করত। নেপোলিয়নও ইংল্যান্ড থেকে ফরাসি সেনাদের জন্য জুতো ও কোট আমদানি করেন।

উপসংহার ইংল্যান্ডের তুলনায় ফ্রান্সের নৌশক্তি বৃদ্ধি, ব্রিটিশ পণ্যের ব্যাপক চাহিদার বিকল্প ব্যবস্থা প্রভৃতি নেপোলিয়ন করতে পারেননি। ফলে বিভিন্ন ঘোষণা সত্ত্বেও তিনি এই অবরোধ বাস্তবায়িত করতে ব্যর্থ হন। ঐতিহাসিক লজ মনে করেন, মহাদেশীয় অবরোধ হল ‘নেপোলিয়নের ব্যর্থতার সর্বাপেক্ষা বড়ো প্রমাণ’।

5. নেপোলিয়নের সাম্রাজ্যের সঙ্গে ফরাসি বিপ্লবের আদর্শগত সংঘাত কী ছিল?

১৭৮৯ খ্রিস্টাব্দের ফরাসি বিপ্লবের ফলে ফ্রান্সের পচনশীল পুরাতন-তন্ত্র ধ্বংস হয়ে নতুন ও আধুনিক ভাবধারা ও আদর্শের বিকাশ ঘটে। ফরাসি বিপ্লব-প্রসূত সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ তিনটি আদর্শ ছিল ‘সাম্য’, ‘মৈত্রী’ ও ‘স্বাধীনতা’।

বৈপ্লবিক ভাবধারা ধ্বংস

১৭৯৯ খ্রিস্টাব্দে নেপোলিয়ন ফ্রান্সের শাসনক্ষমতা দখল করে বিপ্লবের সাম্য ও মৈত্রীর আদর্শ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিলেও তিনি স্বাধীনতার আদর্শ-সহ বিভিন্ন বৈপ্লবিক ভাবধারা ধ্বংস করেন। যেমন-

[1] রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা: বিপ্লবীরা ফ্রান্সের বংশানুক্রমিক রাজতন্ত্রের উচ্ছেদ ঘটিয়ে প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে। কিন্তু নেপোলিয়ন ফ্রান্সের শাসনক্ষমতা দখল করে ১৮০৪ খ্রিস্টাব্দে নিজেকে ‘সম্রাট’ হিসেবে ঘোষণা করেন। এভাবে তিনি দেশে পুনরায় চূড়ান্ত স্বৈরাচারী বংশানুক্রমিক রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন। ফলে বিপ্লবের মূল লক্ষ্যটিই ব্যর্থ হয়ে যায়।

[2] স্বাধীনতার আদর্শ ধ্বংস: নেপোলিয়ন ফ্রান্সের মানুষের স্বাধীনতা ধ্বংস করেন। তিনি-[i] প্রাদেশিক আইনসভাগুলির ক্ষমতা কেড়ে নেন। [ii] মানুষের বাকস্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা কেড়ে নেন। [iii] বিনা বিচারে যে-কোনো ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের নিয়ম চালু করেন। [iv] নাটক ও নাট্যশালার ওপর পুলিশি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন। [v] সর্বজনীন প্রাপ্তবয়স্কের ভোটাধিকার ঘোষণা করলেও জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটদানের অধিকার স্বীকার করেননি। [vi] বুর্জোয়া শ্রেণিকে বেশি অধিকার ভোগের সুযোগ করে দেন।

[3] শিক্ষাক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ: নেপোলিয়ন বিপ্লবী জ্যাকোবিনদের সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষার আদর্শ বাতিল করেন এমন শিক্ষার প্রবর্তন করেন যাতে শিক্ষার্থীরা সম্রাট ও রাষ্ট্রের প্রতি একান্ত অনুগত হয়। ছাত্ররা যাতে সম্রাট ও রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ না করে সেই উদ্দেশ্যে ইতিহাস ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পাঠ্যসূচিতে পরিবর্তন আনা হয়।

[4] বিপ্লবের সন্তান: ফরাসি বিপ্লবের বিভিন্ন ভাবধারা ধ্বংস করায় ঐতিহাসিক জর্জ বুডে নেপোলিয়নকে ‘বিপ্লবের সন্তান’ বলে স্বীকার করেননি। নেপোলিয়ন নিজেও তাঁর আত্মজীবনীতে পৃথক প্রসঙ্গে নিজেকে ‘বিপ্লবের সন্তান’ (‘Child of Revolution’) ও ‘বিপ্লবের ধ্বংসকারী’ (‘Destroyer of Revolution’) বলে স্বীকার করেছেন।

মূল্যায়ন: নেপোলিয়ন যখন বিপ্লব-বিধ্বস্ত ফ্রান্সে শান্তি, স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি আনেন তখন তিনি নিঃসন্দেহে ‘বিপ্লবের সন্তান’ ছিলেন। আবার তিনি যখন গণতান্ত্রিক জনপ্রতিনিধিমূলক প্রতিষ্ঠানগুলির বিলোপ ঘটান, দেশে রাজতন্ত্র ফিরিয়ে আনেন এবং স্বাধীনতার আদর্শ ধ্বংস করেন তখন তিনি ছিলেন ‘বিপ্লবের ধ্বংসকারী’। ঐতিহাসিক ওলার মনে করেন যে, নেপোলিয়ন সামাজিক সাম্য অপেক্ষা বৈষম্যই সৃষ্টি করেন।

[প্রশ্নমান 8]

1. ১৮ ব্রুমেয়ার বলতে কী বোঝো?

ফরাসি সেনাপতি নেপোলিয়ন বোনাপার্ট ডাইরেক্টরির শাসনের অবসান ঘটিয়ে ফ্রান্সে ‘কনসুলেট’ নামে নতুন শাসনব্যবস্থা চালু করেন এবং নিজে প্রথম কনসাল হিসেবে ফ্রান্সের শাসনক্ষমতা হস্তগত করেন। বিভিন্ন ঐতিহাসিক এই ঘটনাকে ফরাসি বিপ্লবের সমাপ্তি বলে মনে করেন। এই ঘটনা ঘটেছিল ১৭৯৯ খ্রিস্টাব্দের ৯ নভেম্বর অর্থাৎ প্রজাতন্ত্রী ফ্রান্সের ক্যালেন্ডার অনুসারে ১৮ ব্রুমেয়ার তারিখে, এজন্য এই ঘটনাকে ‘১৮ – বুমেয়ার’ বলা হয়।

2. অক্টোবরের ঘটনা কী?

ফরাসি বিপ্লবের (১৭৮৯ খ্রি.) পরবর্তীকালে রাজতন্ত্রের সমর্থক উন্মত্ত জনতা ১৭৯৫ খ্রিস্টাব্দের ৫ অক্টোবর ফরাসি জাতীয় সভা আক্রমণ করলে ফরাসি ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নেপোলিয়ন অল্প সংখ্যক সৈন্য নিয়ে জনতাকে ছত্রভঙ্গ করেন এবং জাতীয় সভা রক্ষা করেন। এটি ‘ভদেমিয়ার | ঘটনা’ বা ‘অক্টোবরের ঘটনা’ নামে পরিচিত।

3. কনস্যুলেটের শাসন কী?

ফরাসি সেনাপতি নেপোলিয়ন ১৭৯৯ খ্রিস্টাব্দে ডাইরেক্টরির শাসনের অবসান ঘটিয়ে (৯ নভেম্বর, ১৭৯৯ খ্রি.) ফ্রান্সে এক নতুন শাসনব্যবস্থা চালু করেন। এই ব্যবস্থায় নেপোলিয়ন-সহ মোট ৩ জন কনসালের হাতে ফ্রান্সের শাসনভার তুলে দেওয়া হয়। এটি ‘কনসুলেটের শাসন’ নামে পরিচিত।

4. কবে ও কাদের মধ্যে নীলনদের যুদ্ধ হয়েছিল?

নীলনদের যুদ্ধ ১৭৯৮ খ্রিস্টাব্দে ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডের মধ্যে হয়েছিল। এই যুদ্ধে ব্রিটিশ নৌ-সেনাপতি নেলসনের হাতে নেপোলিয়ন পরাজিত হন।

5. কোড নেপোলিয়ন বলতে কী বোঝো?

ফ্রান্সের শাসক নেপোলিয়ন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে প্রচলিত আইনগুলির পার্থক্য দূর করে এবং পরস্পর বিরোধী আইনগুলির মধ্যে সামঞ্জস্য বিধান করে ১৮০৪ খ্রিস্টাব্দে দেশে এক নতুন আইনব্যবস্থা চালু করেন। এটি ‘কোড নেপোলিয়ন’ বা ‘নেপোলিয়নের আইনসংহিতা’ নামে পরিচিত।

6. নেপোলিয়নকে দ্বিতীয় জাস্টিনিয়ান বলা হয় কেন?

ফরাসি শাসক নেপোলিয়ন ১৮০৪ খ্রিস্টাব্দে ‘কোড নেপোলিয়ন’ নামে নতুন আইনসংহিতা প্রণয়ন করেন। সমকালীন যুগের চেয়ে প্রগতিশীল এই আইনব্যবস্থা ছিল নেপোলিয়নের সর্বাপেক্ষা গৌরবময় সংস্কার এবং সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য কীর্তি। এই কৃতিত্বের জন্য নেপোলিয়নকে ‘দ্বিতীয় জাস্টিনিয়ান’ বলে অভিহিত করা হয়।

7. ধর্ম মীমাংসা চুক্তি কী?

ফরাসি বিপ্লবকালে ‘সিভিল কনস্টিটিউশন অব দ্য ক্লার্জি’ নামে এক দলিল দ্বারা ফরাসি গির্জার জাতীয়করণ করা হলে ফরাসি রাষ্ট্রের সঙ্গে পোপের বিরোধ বাধে। এই বিরোধের মীমাংসার উদ্দেশ্যে নেপোলিয়ন পোপ সপ্তম পায়াস-এর সঙ্গে যে চুক্তি স্বাক্ষর করেন তা ‘কনকর্ডাট’ বা ‘ধর্ম-মীমাংসা চুক্তি’ নামে পরিচিত।

8. লিজিওন অফ অনার কী?

ফরাসি সম্রাট নেপোলিয়ন রাজকর্মচারীদের উৎসাহিত করার উদ্দেশ্যে দক্ষ কর্মচারীদের একটি বিশেষ রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রদানের উদ্যোগ নেন। এই সম্মান ‘লিজিয়ন অব অনার’ নামে খ্যাত।

9. নেপোলিয়নকে বিপ্লবের সন্তান বলা হয় কেন?

নেপোলিয়নকে ‘বিপ্লবের সন্তান’ বলা হয়, কারণ- [1] ফরাসি বিপ্লবের উদারনীতি নেপোলিয়নকে ফ্রান্সের ক্ষমতা দখলে সহায়তা করেছিল। [2] ফরাসি বিপ্লব-প্রসূত সাম্য ও মৈত্রীর আদর্শ নেপোলিয়ন তাঁর শাসনকালে কার্যকর করেছিলেন। [3] ফরাসি বিপ্লবের মূল আদর্শগুলি তিনি ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে দেন।

10. মহাদেশীয় অবরোধ ব্যবস্থা বলতে কী বোঝো?

ফরাসি সম্রাট নেপোলিয়ন বার্লিন, মিলান, ওয়ারশ, ফঁতেনব্লু প্রভৃতি ডিক্রির মাধ্যমে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক অবরোধ ঘোষণা করে বলেন যে, ইংল্যান্ডের কোনো জাহাজ ইউরোপের কোনো বন্দরে প্রবেশ করতে পারবে না এবং ইউরোপের কোনো রাষ্ট্র ইংল্যান্ড থেকে পণ্য আমদানি করতে পারবে না। এই নীতি ‘মহাদেশীয় ব্যবস্থা’ বা ‘মহাদেশীয় অবরোধ ব্যবস্থা’ বা ‘কন্টিনেন্টাল সিস্টেম’ নামে পরিচিত।

11. বার্লিন ডিক্রিতে কী বলা হয়েছিল?

ফরাসি সম্রাট নেপোলিয়ন ১৮০৬ খ্রিস্টাব্দে (১১ নভেম্বর) বার্লিনে এক হুকুমনামা বা ঘোষণা জারি করে বলেন যে-[1] ইংল্যান্ড বা তার উপনিবেশগুলির কোনো জাহাজ ফ্রান্স এবং ফ্রান্সের মিত্র বা নিরপেক্ষ কোনো দেশে ঢুকতে দেওয়া হবে না। [2] এসব দেশে কোনো ব্রিটিশ পণ্য ঢুকতে দেওয়া হবে না। [3] এসব দেশে কোনো জাহাজে করে ব্রিটিশ পণ্য ঢুকলে তা বাজেয়াপ্ত করা হবে। এই ঘোষণা বার্লিন ডিক্রি নামে পরিচিত।

12. অর্ডারস ইন কাউন্সিলে কী বলা হয়েছিল?

ইংল্যান্ড কর্তৃক ঘোষিত ‘অর্ডার্স-ইন-কাউন্সিল’-এর ঘোষণায় বলা হয় যে-[1] ফ্রান্স ও তার মিত্র দেশগুলির বন্দরে অন্য কোনো দেশের জাহাজ ঢুকতে পারবে না। ঢুকলে সেই জাহাজ ও তার মালপত্র বাজেয়াপ্ত করা হবে। [2] কোনো নিরপেক্ষ দেশ ফ্রান্স ও তার মিত্র কোনো দেশের বন্দরে একান্তই জাহাজ পাঠাতে চাইলে সেই জাহাজকে যথার্থ ফি দিয়ে ইংল্যান্ডের কাছ থেকে লাইসেন্স বা আগাম অনুমতি নিতে হবে।

13. পোড়ামাটি নীতি কী?

ফরাসি সম্রাট নেপোলিয়ন ১৮১২ খ্রিস্টাব্দে রাশিয়া আক্রমণ করলে রাশিয়া সম্মুখ যুদ্ধ এড়িয়ে সাম্রাজ্যের অভ্যন্তরে ক্রমাগত পিছু হটতে থাকে। ফরাসি বাহিনী রাশিয়ায় যাতে সমস্যায় পড়ে সে উদ্দেশ্যে পিছু হটার সময় রুশ বাহিনী নিজেদের রাস্তাঘাট ও সেতু ধ্বংস করে, খাদ্যশস্য, শস্যক্ষেত্র, শহর, জনপদ প্রভৃতি আগুনে পুড়িয়ে, পানীয় জলে বিষ মিশিয়ে দিয়ে যায়। রুশ বাহিনীর এই পদক্ষেপ ‘পোড়ামাটি নীতি’ নামে পরিচিত।

14. স্পেনীয় ক্ষত কী?

ফরাসি সম্রাট নেপোলিয়ন স্পেন দখল করে সেখানকার সিংহাসনে নিজের ভাই জোসেফকে বসিয়ে দিলে স্পেনবাসী নেপোলিয়নের বিরুদ্ধে তীব্র মুক্তিসংগ্রাম শুরু করে। স্পেনের যুদ্ধে নেপোলিয়নের বাহিনীর শোচনীয় পরাজয় ঘটে এবং জোসেফ স্পেন থেকে ফিরে আসতে বাধ্য হন। স্পেনে নেপোলিয়নের এই সামরিক ব্যর্থতা ‘স্পেনীয় ক্ষত’ নামে পরিচিত।

15. শত দিবসের রাজত্ব কী?

১৮১৫ খ্রিস্টাব্দের শুরুতে ফ্রান্সে গোলযোগের পরিস্থিতিতে নেপোলিয়ন এলবা দ্বীপের নির্বাসন থেকে পালিয়ে ফ্রান্সে ফিরে আসেন (মার্চ, ১৮১৫ খ্রি.)। সাধারণ মানুষ তাঁকে সাদর অভ্যর্থনা জানালে রাজা অষ্টাদশ লুই সিংহাসন ছেড়ে পালিয়ে যান। এরপর তিনি ২০ মার্চ থেকে ২৯ জুন (১৮১৫ খ্রি.) পর্যন্ত মোট ১০০ দিন রাজত্ব করেন। এই ঘটনা ‘শতদিবসের রাজত্ব’ নামে পরিচিত।

16. কনফারেশন অফ দ্য রাইন কী?

ফরাসি সম্রাট নেপোলিয়ন জার্মানির উটেমবার্গ, বেডেন, হেসবার্গ প্রভৃতি ছোটো ছোটো রাজ্য দখল করে এদের নিয়ে কনফেডারেশন বা রাষ্ট্র-সমবায় গঠন করেন। এটি ‘কনফেডারেশন অব দ্য রাইন’ নামে পরিচিত।

আরো পড়ুন : নবম শ্রেণি ইতিহাস বিষয়ের সমস্ত অধ্যায়ের প্রশ্ন উত্তর

Leave a Comment