১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের বিদ্রোহের প্রভাব বা ফলাফল আলোচনা করো

১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের বিদ্রোহ ছিল ব্রিটিশ ভারতের ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী ঘটনা, যা নানাভাবে ভারতের রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও আর্থসামাজিক ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করেছে। এই বিদ্রোহ প্রথম ভারতের উপর ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্তৃত্বের মূলে নাড়া দেয়। স্যার লেপেল গ্রিফিন (Sir Lepel Griffin) মন্তব্য করেছেন যে, ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের বিদ্রোহ ভারতের আকাশ থেকে অনেক মেঘ সরিয়ে দিয়েছে (The Revolt of 1857 swept the Indian sky clear of many clouds)। এই বিদ্রোহের প্রভাব বা ফলাফলগুলি হল-
১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দের ভারত শাসন আইন: কোম্পানি শাসনের অবসান
১৮৫৭-র বিদ্রোহের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রভাব হল ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দের ভারত শাসন আইন প্রণয়ন এবং তার দ্বারা ভারতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনের অবসান।
পটভূমি: ভারতে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনের অবসান কিন্তু কোনও আকস্মিক ঘটনা ছিল না। প্রাক্-বিদ্রোহ পর্বে অর্থাৎ, ১৭৭৩ খ্রিস্টাব্দের রেগুলেটিং অ্যাক্ট, ১৭৮৪-র পিটের ভারত শাসন আইন এবং ১৮৩৩ ও ১৮৫৩-র সনদ আইনের মাধ্যমে ধাপে ধাপে কোম্পানির শাসনের উপর ব্রিটিশ সরকার নিয়ন্ত্রণ আরোপ করছিল। এরপর যখন বিদ্রোহ সংঘটিত হয় তখন ব্রিটিশ সরকার উপলব্ধি করে যে, ভারতবর্ষের মতো একটি বিশাল দেশের শাসনভার একটি বণিক কোম্পানির হাতে ছেড়ে রাখা উচিত নয়। এই অবস্থায় কোম্পানির শাসনের অবসানের মাধ্যমে প্রত্যক্ষভাবে ব্রিটিশ সরকারের হাতে শাসনভার তুলে দেওয়ার উদ্দেশ্যে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী লর্ড পামারস্টোন (Lord Palmerston) একটি বিল পার্লামেন্টে পেশ করেন। এই প্রেক্ষিতে পাস হয় ভারত শাসন আইন (১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দ)।
১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দের ভারত শাসন আইনের বিষয়বস্তু: ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দের ২ আগস্ট ব্রিটিশ পার্লামেন্ট যে আইন দ্বারা ভারতে সরাসরি ব্রিটিশ সরকারের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে, তার পোশাকি নাম হল অ্যান অ্যাক্ট ফর দ্য বেটার গভর্নমেন্ট অফ ইন্ডিয়া (An Act for the Better Government of India, 1858) বা সংক্ষেপে ১৮৫৮ র ভারত শাসন আইন। এই আইন অনুসারে-
- রানি ভিক্টোরিয়ানে ব্রিটিশ ভারতের সম্রাজ্ঞী ঘোষণা করা হয়।
- ব্রিটিশ মন্ত্রীসভার একজ সদস্যকে ভারত-সচিব (Secretary of State for India) পদে নিয়োগ করে তাঁর হাতে ভারতের শাসন তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
- অতঃপর স্থির হয়, ব্রিটিশ ভারতের ‘গভর্নর জেনারেল’ ভাইসরয় (Viceroy) বা রাজপ্রতিনিধি হিসেবে শাসন কাজ চালাবেন। তিনি ভারত-সচিবের নির্দেশানুসারে কাজ করবেন। ভারতের প্রথম ভাইসরয় হন লর্ড ক্যানিং (Lord Canning)। ১ নভেম্বর থেকে এই আইন বলবৎ হয়।
মহারানির ঘোষণাপত্র
বিদ্রোহের উত্তাপ প্রশমিত করার জন্য ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দের ১ নভেম্বর ইংল্যান্ডেশ্বরী মহারানি ভিক্টোরিয়া (Queen Victoria) এক ঘোষণাপত্র প্রকাশ করেন। এটি মহারানির ঘোষণাপত্র (Queen’s Proclamation) নামে পরিচিত। ভাইসরয় লর্ড ক্যানিং এলাহাবাদে একটি দরবারের আয়োজন করে আনুষ্ঠানিকভাবে মহারানির ঘোষণাপত্রটি প্রকাশ করেন। ভিক্টোরিয়ার প্রধানমন্ত্রী ডারবি (Lord Derby) এই ঘোষণাপত্র রচনা করেছিলেন। উল্লেখ্য, কলকাতায় অবস্থিত ভিক্টোরিয়া স্মৃতিসৌধের গায়ে মর্মরফলকে এর অঙ্গীকারগুলি খোদিত রয়েছে।
মূল বক্তব্য: মহারানির ঘোষণাপত্রের মূল উদ্দেশ্য ছিল আপামর ভারতবাসীর মনে একাধারে ব্রিটিশ সরকার এবং পার্লামেন্টের প্রতি আস্থা অর্জন করা। এতে ভারতীয়দের আশ্বস্ত করা হয় এই বলে যে-
- ভারতবাসীর ধর্মীয় ও সামাজিক ব্যাপারে ব্রিটিশ সরকার কোনোরকম হস্তক্ষেপ করবে না।
- সকল ভারতবাসী ধর্মীয় স্বাধীনতা ভোগ করবেন।
- জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে যোগ্যতাসম্পন্ন সকল ভারতীয়রা সরকারি চাকুরিতে নিযুক্ত হতে পারবেন।
- স্বত্ববিলোপ নীতি প্রত্যাহার করা হবে এবং দেশীয় রাজারা দত্তকপুত্র গ্রহণ করতে পারবেন।
- সরকার ভারতে সাম্রাজ্য বিস্তারের নীতি ত্যাগ করবে।
- দেশীয় রাজাদের আশ্বস্ত করে ঘোষণা করা হয় যে, কোম্পানির সঙ্গে তাঁদের স্বাক্ষরিত সব চুক্তি মেনে চলা হবে।
মহারানির ঘোষণাপত্রের ঐতিহাসিক তাৎপর্য: ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির একশো বছরের অপশাসনে সৃষ্ট গভীর ক্ষতে প্রলেপ দিতে গিয়ে এই ঘোষণাপত্রে অনেক প্রতিশ্রুতি প্রদান করা হলেও তা সঠিকভাবে পালিত হয়নি। এই ঘোষণাপত্রের দ্বারা-
- ব্রিটিশ সরকার বিদ্রোহের কারণগুলি অনুধাবন করে সেগুলির প্রতিকারের চেষ্টা করলেও তা ব্যর্থ হয়।
- দেশীয় রাজন্যবর্গকে স্বশাসনের অধিকার দেওয়া হলেও উত্তরাধিকার সংক্রান্ত বিরোধে ভাইসরয়ের সিদ্ধান্তকেই চূড়ান্ত বলে ঘোষণা করা হয়।
- এই ঘোষণাপত্রের দ্বারা সামন্ততান্ত্রিক দেশীয় রাজন্যবর্গ ও ভূস্বামী শ্রেণির আনুগত্যের উপরই গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল, শিক্ষিত শ্রেণির দাবিদাওয়াকে তেমন গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।
- এই ঘোষণাপত্রের দ্বারা পুরোনো সাম্রাজ্যবাদী শাসনের মূল চরিত্রের কোনও বদল ঘটেনি, পরিবর্তন ঘটেছিল কেবল বহিরঙ্গেই।
এই সকল কারণে ঐতিহাসিক রমেশচন্দ্র মজুমদার এই ঘোষণাপত্রকে প্রতিশ্রুতিভঙ্গের অধ্যায়ের সূচনাকাল বলে চিহ্নিত করেছেন। বহু ঐতিহাসিক এই ঘোষণাপত্রকে রাজনৈতিক ধাপ্পা বা রাজনৈতিক প্রহসন বলেছেন।
প্রশাসনিক সংস্কার
১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের বিদ্রোহের পর ব্রিটিশ সরকার সরাসরি ভারতের শাসনক্ষমতা নিজ হাতে তুলে নিলে বেশকিছু শাসনতান্ত্রিক তথা প্রশাসনিক সংস্কার সাধিত হয়। পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু তাঁর The Discovery of India গ্রন্থে লিখেছেন, ‘১৮৫৭-এর বিদ্রোহ প্রত্যক্ষভাবে দেশের কিছু অংশকে প্রভাবিত করলেও, তা সমগ্র ভারত, তথা ব্রিটিশ প্রশাসনকে কাঁপিয়ে তুলেছিল।’F
ভারত-সচিবের অগাধ ক্ষমতা: ব্রিটিশ সরকার ভারত প্রশাসন সংক্রান্ত বিষয়ে যেসব সংস্কার করেছিল, তার মধ্যে অন্যতম হল সেক্রেটারি অফ স্টেট বা ভারত-সচিবের পদ সৃষ্টি। ১৭৮৪ খ্রিস্টাব্দে পিটের ভারত শাসন আইন অনুসারে বোর্ড অফ কন্ট্রোল, কোর্ট অফ ডিরেক্টরস ও সিক্রেট কমিটি লন্ডন থেকে ভারতীয় প্রশাসন নিয়ন্ত্রণ করত। এবার এই সংস্থাগুলি বাতিল করে ১৫ সদস্যবিশিষ্ট ইন্ডিয়া কাউন্সিল (India Council) গঠিত হয়। এই কাউন্সিল ভারত-সচিবকে পরামর্শ দেওয়া ও সাহায্য করার জন্য নিযুক্ত ছিল।
ইতিপূর্বে বোর্ড অফ কন্ট্রোল ও কোর্ট অফ ডিরেক্টরস যেসকল ক্ষমতা ভোগ করত এবার তার অধিকারী হন ভারত-সচিব। তিনি তাঁর কাজের জন্য কেবলমাত্র পার্লামেন্টের কাছেই দায়বন্ধ থাকতেন। ইন্ডিয়া কাউন্সিলের পরামর্শ গ্রহণ করা বা না করা তাঁর কাছে বাধ্যতামূলক ছিল না। অন্যদিকে, ভাইসরয়ও ছিলেন তাঁর কর্তৃত্বাধীন। সুতরাং, ভারত-সচিব যে অগাধ ক্ষমতা ভোগ করতেন তা বলাই বাহুল্য।
আইন পরিষদে ভারতীয়দের গ্রহণ: বিদ্রোহের আগে ভারতীয় প্রশাসনে ভারতীয়দের যোগদানের ব্যবস্থা ছিল না। কিন্তু বিদ্রোহের পর ভারতীয় প্রশাসনে ভারতবাসীর মতামত গ্রহণের জন্য ভারতীয় পরিষদীয় আইন (Indian Councils Act, 1861) পাস হয়। এই আইন অনুসারে বড়োলাট বা ভাইসরয়-এর আইন পরিষদের সদস্যসংখ্যা বাড়ানো হয় এবং সেখানে ভারতীয়দের নিযুক্তির ব্যবস্থা করা হয়। একইভাবে প্রদেশগুলিতেও (বাংলা, মাদ্রাজ ও বোম্বাই) ছোটোলাট বা গভর্নরের পরিষদে ভারতীয় সদস্য নিযুক্ত করার ব্যবস্থা করা হয়।
সামরিক সংস্কার
অসামরিক ও সামরিক জাতিতে ভাগ: ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের বিদ্রোহের উৎসস্থল ছিল সেনাবাহিনী, তাই সেনাবাহিনীতে বড়োসড়ো পরিবর্তন ঘটানো হয়। ভবিষ্যতে সেনা বিদ্রোহের আশঙ্কার কথা মাথায় রেখে ভারতীয় জাতিগোষ্ঠীগুলিকে বিভেদনীতির সাহায্যে দুভাগে বিভক্ত করা হয়- অসামরিক জাতি এবং সামরিক জাতি। যেসব জাতিগোষ্ঠীর সেনা ১৮৫৭খ্রিস্টাব্দের বিদ্রোহে যোগ দিয়েছিলেন, তাদের অসামরিক জাতি (Non-Martial Race) হিসেবে চিহ্নিত করে তাদের মধ্যে থেকে সেনানিয়োগ নিষিদ্ধ হয়। যেমন-বাঙালি, বিহারি, অযোধ্যাবাসী ইত্যাদি। বিদ্রোহের উৎসকেন্দ্র বেলাল আর্মি ভেঙে দেওয়া হয়। ফলে ভারতীয় সেনার সংখ্যা কমে দাঁড়ায় প্রায় ১ লক্ষ।
অন্যদিকে, শ্বেতাঙ্গ সেনার সংখ্যা ১৫ হাজার বাড়ানো হয়। আর যেসব জাতিগোষ্ঠীর সেনারা বিদ্রোহ দমনে ইংরেজ সরকারকে সাহায্য করেছিলেন তারা সামরিক জাতি (Martial Race) হিসেবে চিহ্নিত হন। ভবিষ্যতে এদের মধ্য থেকে বেশি সংখ্যায় সেনা নিয়োগের নীতি গৃহীত হয়। যেমন- পাঠান, শিখ, গোর্খা, রাজপুত প্রভৃতি।
অন্যান্য বৈষম্যমূলক পদক্ষেপ: এ ছাড়া ভবিষ্যতে ভারতীয় সিপাহিদের ঐক্যবদ্ধতার যাবতীয় সম্ভাবনা নির্মূল করতে তথা সমজাতীয় চরিত্র ভেঙে ফেলতে সেনা রেজিমেন্টে ইংরেজ ও ভারতীয় সেনার অনুপাত রাখা হয় ৩: ১। রেজিমেন্টে বিভিন্ন জাতি, ধর্ম ও গোষ্ঠীর সিপাহি রেখে জাতিগত ঐক্যের সম্ভাবনা শিথিল করা হয়। বাহিনীতে ভারতীয়দের নিয়োগ নিষিদ্ধ হয়। গোলন্দাজ সেনাপতি দায়িত্ব থাকে কেবলমাত্র শ্বেতাঙ্গদের হাতে। সামরিক ও ভৌগোলিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটিগুলিতে কেবলমাত্র ইউরোপীয় সেনা মোতায়েন করা হয়।
জাতীয়তাবাদের উপর প্রভাব
বিশিষ্ট ঐতিহাসিক পার্সিভ্যাল স্পিয়ার (Percival Spear) উল্লেখ করেছেন যে, ভারতের জাতীয়তাবোধ উন্মেষের ক্ষেত্রে ১৮৫৭খ্রিস্টাব্দের বিদ্রোহ বেশ খানিকটা প্রভাব ফেলেছিল। ইতিহাসবিদ রজতকান্ত রায়-ও এই বিষয়টি সমর্থন করেছেন-
সংঘবদ্ধ জাগরণ: ১৮৫৭-র বিদ্রোহকে ভারতীয়দের ব্রিটিশবিরোধী প্রথম সংঘবদ্ধ জাগরণের দৃষ্টান্ত বলা যায়। ইতিপূর্বে সংঘটিত আন্দোলনগুলি সবই ছিল গোষ্ঠীকেন্দ্রিক। ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে প্রথম ভারতের নানা জনগোষ্ঠী, নানা পেশা ও সম্প্রদায়ের মানুষ সংঘবদ্ধভাবে আন্দোলনমুখী হন। এক্ষেত্রেও স্বতন্ত্র গোষ্ঠীস্বার্থের চেতনা সক্রিয় ছিল। কিন্তু সকলেই একটি বিষয়ে একমত ছিলেন যে, ইংরেজ আমাদের শত্রু।
জাতীয় চেতনার বিকাশ: ১৮৫৭-র সংঘবদ্ধ গণ আন্দোলন জাতীয় চেতনার প্রসারের সহায়ক ছিল। কে এম পানিক্কর লিখেছেন, ‘সিপাহিদের সীমাবদ্ধতা ও দুর্বলতা সত্ত্বেও, দেশকে বিদেশি শাসন থেকে মুক্ত করার ক্ষেত্রে তাদের প্রয়াস ছিল দেশপ্রেমিকের কাজ এবং প্রগতিশীল পদক্ষেপ।’ বস্তুত, এই বিদ্রোহ নিছক একটা ট্র্যাজেডি নয়। ব্যর্থতা সত্ত্বেও তা ছিল জাতীয় মুক্তি আন্দোলনে প্রেরণার উৎস। ঐতিহাসিক বিপানচন্দ্র যথার্থই লিখেছেন, শৌর্য ও দেশাত্মবোধে সমুজ্জ্বল ১৮৫৭খ্রিস্টাব্দের বিদ্রোহ ভারতবাসীর মনে একটা অবিস্মরণীয় ছাপ রেখে গিয়েছিল। পরবর্তীকালে স্বাধীনতা সংগ্রামে তা প্রেরণার উৎস হয়ে ওঠে।
পত্রপত্রিকার উপর প্রভাব: বিংশ শতকের শুরুতে পরিবর্তন লক্ষ করা যায় পত্রপত্রিকাগুলির লেখাতেও। যুগান্তর ও সন্ধ্যা পত্রিকায় এই বিদ্রোহ ও তার বিদ্রোহীদের স্মৃতিচারণা করা হয়।
অন্যান্য প্রভাবসমূহ
ভারতীয় জনজীবনে ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের বিদ্রোহের আরও কিছু প্রভাব পড়েছিল। সেগুলি হল-
ভারতে ব্রিটিশ পুঁজির অনুপ্রবেশ: ১৮১৩ খ্রিস্টাব্দের সনদ আইনের পর থেকে ভারতে যে ব্রিটিশ পুঁজির অনুপ্রবেশ ঘটেছিল, ১৮৫৭-র বিদ্রোহ পরবর্তীকালে তা বহুল পরিমাণে বৃদ্ধি পায়। বাণিজ্য ও শাসনকার্যের সুবিধার্থে নির্মিত হতে থাকে সেতু, রাস্তাঘাট ও রেলপথ। ভারতের সম্পদ ও সেনাবাহিনী ব্যবহৃত হতে থাকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থে।
সরকারি চাকুরিক্ষেত্রে বঞ্চনা: বিদ্রোহের পর ঔপনিবেশিক শক্তি ইংরেজদের ক্ষোভ নেমে আসে সরকারি চাকুরিক্ষেত্রেও। ১৮৫৩ খ্রিস্টাব্দে যেখানে সিভিল সার্ভিস পরীক্ষার বয়স ২৩ বছর ছিল, ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দে তা কমিয়ে ২২ এবং ১৮৭৩ খ্রিস্টাব্দে তা ১৯ বছর করা হয়। বলাবাহুল্য, এত অল্প বয়সে কোনও ভারতীয়ের পক্ষেই ইংল্যান্ডে গিয়ে এই পরীক্ষায় বসা সম্ভব ছিল না। এ ছাড়া বিভিন্ন সরকারি বিভাগের (পুলিশ, পূর্ত, ডাক, চিকিৎসা) উচ্চপদগুলিও ইংরেজদের জন্যই একচেটিয়া করে রাখা হয়।
বর্ণবিদ্বেষমূলক নীতি গ্রহণ: হিন্দু-মুসলমান ঐক্য এবং সম্মিলিতভাবে ব্রিটিশবিরোধিতা শ্বেতাঙ্গ ইংরেজদের জাত্যভিমানকে আহত করেছিল। তারা ভারতীয়দের কেবল জাতিগতভাবে আলাদা মনে করতেন না, শ্বেতাঙ্গদের তুলনায় নিকৃষ্টও মনে করতেন। এখন থেকে সামরিক ও অসামরিক উচ্চ পদগুলিতে শুধুমাত্র শ্বেতাঙ্গদের নিয়োগ করা শুরু হয়। এইরূপ রক্ষণশীল প্রতিক্রিয়ার ফলে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য স্বৈরতন্ত্রী হয়ে ওঠে। ড. শেখর বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতে, ক্ষমতা ভাগাভাগির দ্বারা ব্রিটিশরাজ শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির আশাভঙ্গ ঘটায়। সেই আশাভঙ্গের হতাশা থেকে উনবিংশ শতকের শেষদিকে আধুনিক জাতীয়তাবাদের উদ্ভব ত্বরান্বিত হয়।
সামন্তব্যবস্থার পুনরুজ্জীবন: বিদ্রোহের অভিঘাত থেকে ব্রিটিশ সরকার উপলব্ধি করে যে, সামন্তব্যবস্থার অবসান নয়, পুনরুজ্জীবনের মধ্যেই ভারতে তাদের সাফল্য নিহিত আছে। এখন সরকার তোষণনীতি দ্বারা দেশীয় রাজন্যবর্গকে ইংরেজ সরকারের অতি অনুগত ও বিশ্বস্ত মিত্রে পরিণত করতে প্রয়াসী হয়। স্বত্ববিলোপ নীতি বাতিল করা হয়। দেশীয় রাজ্যের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে না-হস্তক্ষেপ নীতি গ্রহণের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। জওহরলাল নেহরু তাঁর Discovery of India গ্রন্থে লিখেছেন যে, সরকার এখন থেকে শোষণ-সহায়ক কৌশলগুলি ভালোভাবে কাজে লাগাতে চেষ্টা করে।
উপরোক্ত বিষয়গুলি ছাড়াও ঔপনিবেশিক সরকার শিক্ষার প্রসার, জনহিতকর কার্যাবলি, সমাজসংস্কার ইত্যাদি ব্যাপারে অনাগ্রহ দেখায়। এইভাবে ভেদনীতির প্রচার এবং ভারতীয়দের অগ্রগতির পথকে সংকুচিত করে তারা পরবর্তী প্রায় ১০০ বছরের জন্য সাম্রাজ্যবাদী শাসন চালাতে থাকেন।
আরো পড়ুন : উচ্চমাধ্যমিক চতুর্থ সেমিস্টার দর্শন প্রশ্ন উত্তর
আরো পড়ুন : উচ্চমাধ্যমিক চতুর্থ সেমিস্টার বাংলা প্রশ্ন উত্তর
আরো পড়ুন : উচ্চমাধ্যমিক চতুর্থ সেমিস্টার রাষ্ট্রবিজ্ঞান প্রশ্ন উত্তর