ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে জনঘনত্বের তারতম্যের প্রধান কারণগুলি ব্যাখ্যা করো

ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে জনঘনত্বের তারতম্যের প্রধান কারণগুলি ব্যাখ্যা করো
ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে জনঘনত্বের তারতম্যের প্রধান কারণগুলি ব্যাখ্যা করো।
বিশ্বের দ্বিতীয় জনবহুল দেশ হল ভারত। ভারতের জনসংখ্যার প্রধান বৈশিষ্ট্য হল এর অসম বণ্টন। ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে জনবণ্টনের তারতম্যের কারণগুলি হল–

A প্রাকৃতিক ভৌগোলিক কারণ :

ভূপ্রকৃতি: 

ভারতে ভূপ্রকৃতিগত বৈচিত্র্য জনসংখ্যার অসম বণ্টনের জন্য প্রধানত দায়ী। উত্তরের হিমালয় পার্বত্য অঞ্চল, উত্তর-পূর্বের পাহাড়ি অঞ্চল এবং দক্ষিণ ভারতের পার্বত্য অঞ্চলের ভূপ্রকৃতি বন্ধুর ও দুর্গম। ফলে পরিবহণ ও যোগাযোগ ব্যবস্থার অভাব এবং কৃষি ও শিল্পের বিকাশের অভাবের জন্য এই সমস্ত অঞ্চলে বিক্ষিপ্ত জনবসতি গড়ে উঠেছে। ভারতের নদী উপত্যকা ও বদ্বীপগুলির উর্বর পলিগঠিত সমভূমি অঞ্চলে উন্নত পরিবহণ ও যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং কৃষি ও শিল্পের উন্নতির জন্য জনঘনত্ব বেশি।
যেমন- গাঙ্গেয় সমভূমি। মালভূমি অঞ্চলের উঁচু-নীচু ও অনুর্বর ভূভাগ কৃষির উপযোগী নয় বলে জনঘনত্ব কম। তবে ছোটোনাগপুর মালভূমিতে খনিজ সম্পদের প্রাচুর্যতার জন্য অধিক জনঘনত্ব লক্ষ করা যায়।

নদনদী: 

ভারত নদীমাতৃক দেশ। গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র, সিন্ধু, গোদাবরী, কৃষ্ণা, কাবেরী, নর্মদা প্রভৃতি নদী অববাহিকায় কৃষিকাজ, জলসেচ, জলপথে পরিবহণ, পানীয় জল সরবরাহ, শিল্পের প্রয়োজনীয় জল পাওয়া, জলবিদ্যুৎ উৎপাদন প্রভৃতির সুবিধা থাকায় জনসংখ্যার ঘনত্ব অনেক বেশি।

জলবায়ু: 

ভারতের বিভিন্ন স্থানের জলবায়ু বিভিন্ন হওয়ায় জনসংখ্যার তারতম্য লক্ষ করা যায়। যেমন- হিমালয় ও দক্ষিণ ভারতের পার্বত্য অঞ্চলে অধিক শৈত্যের কারণে জনবসতি কম। উপকূল অঞ্চলের মনোরম জলবায়ুতে জনসংখ্যা বেশি। থর মরুভূমি অঞ্চলে অত্যধিক উন্নতা ও স্বল্প বৃষ্টিপাতের কারণে জনসংখ্যা কম। ভারতের উত্তর-পূর্বের পাহাড়ি রাজ্যগুলিতে স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়ার জন্য জনবসতি কম। মূলত ভারতের বৃষ্টিপাতের অসম বণ্টন জনবণ্টনের তারতম্যের অন্যতম কারণ। তাই বলা হয়, The Population Map of India follows the Rainfall Map |

মৃত্তিকা: 

উর্বর মৃত্তিকা অঞ্চলে কৃষিকাজ ভালো হওয়ায় জনবসতি ঘন হয়। যেমন- গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র, শতদ্রু প্রভৃতি নদীর অববাহিকার উর্বর পলিমাটি, দাক্ষিণাত্য মালভূমির উর্বর কৃষ্ণ মৃত্তিকাযুক্ত অঞ্চল ঘনবসতিপূর্ণ। আবার, দক্ষিণ ভারতের লালমাটি, ল্যাটেরাইট মাটি, রাজস্থানের মরু অঞ্চলের সিরোজেম মাটি অনুর্বর হওয়ায় জনসংখ্যা কম।

বনভূমি: 

ভারতের গভীর বনভূমি অঞ্চলের জনসংখ্যা কম। যেমন- উত্তর পূর্বের পার্বত্য অঞ্চল, পশ্চিমঘাট পার্বত্য অঞ্চল, আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ প্রভৃতি। তবে বনজ সম্পদ সংগ্রহের সুবিধার কারণে বনভূমির প্রান্তভাগে কিছু জনবসতি দেখা যায়।

খনিজ সম্পদ: 

খনিজ সম্পদ উত্তোলন ও আনুষঙ্গিক শিল্পকে কেন্দ্র করে ঘন জনবসতি গড়ে ওঠে। এই কারণে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল যেমন- ছোটোনাগপুর মালভূমি অঞ্চলে বন্ধুর ভূমিরূপ ও অনুর্বর মৃত্তিকা হওয়ার সত্ত্বেও খনিজ সম্পদের প্রাচুর্যতার জন্য জনসংখ্যার ঘনত্ব বৃদ্ধি পেয়েছে।

B অর্থনৈতিক কারণ :

কৃষি ও পশুপালন: 

ভারতের যেসব অঞ্চলে উর্বর মৃত্তিকা, জলসেচের সুবিধা প্রভৃতি কারণের জন্য কৃষিকাজ উন্নত, সেইসব অঞ্চলে জনঘনত্ব বেশি। যেমন- উত্তর ভারতের সমভূমি। আবার, গুজরাটের উত্তরাংশ অনুর্বর হলেও পশুপালনের কারণে বেশি লোক বাস করে।

শিল্পের প্রসার: 

ভারতের যে-সকল অঞ্চলে শিল্পের প্রসার ঘটেছে সেই সকল অঞ্চলে কর্মসংস্থানের সুযোগ থাকায় প্রচুর মানুষ মিলিত হয়ে বসতি স্থাপন করেছে। যেমন- হুগলি শিল্পাঞ্চল, দুর্গাপুর-আসানসোল শিল্পাঞ্চল, পশ্চিম ভারতের কার্পাস বয়ন শিল্প অঞ্চল প্রভৃতি।

যোগাযোগ ব্যবস্থা: 

ভারতের সমভূমি অঞ্চলে সড়কপথ, রেলপথ জালের মতো বিস্তারলাভ করেছে বলেই জনঘনত্ব বেশি। আবার, যোগাযোগ ব্যবস্থার অনুন্নতি হিমালয় পার্বত্য অঞ্চলের কম জনবসতির জন্য দায়ী।

পর্যটন : 

(i) পাহাড়ি অঞ্চল যেমন- সিমলা, দার্জিলিং, উটি-কে কেন্দ্র করে পর্যটন শিল্প বিকাশলাভ করেছে। (ii) মালভূমি অঞ্চল যেমন- বর্তমানে পুরুলিয়াকে (অযোধ্যা, বড়ান্তি, মুর্গুমা) কেন্দ্র করে পর্যটন শিল্প বিকাশলাভ করেছে। (iii) এ ছাড়া বিভিন্ন স্থাপত্যশৈলীর জন্য খাজুরাহো, অজন্তা, ইলোরা প্রভৃতি অঞ্চলে পর্যটনকে কেন্দ্র করে শহর গড়ে উঠেছে। (iv) পুরী, দিঘা, বিশাখাপত্তনমে সমুদ্র সৈকতকে কেন্দ্র করে শহর গড়ে উঠেছে।

C সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কারণ :

নগরায়ণ : 

ভারতে শহর-নগরের বিকাশ ক্রমশই বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই শহর বা নগরগুলির জনসংখ্যা তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি। যেমন- মুম্বাই, কলকাতা, দিল্লি, চেন্নাই প্রভৃতি।

ধর্মীয় কারণ: 

ভারতের ধর্মীয় স্থানগুলির জনসংখ্যা অনেক বেশি হয়। যেমন- বারাণসী, আজমীর, বুদ্ধগয়া, পুরী, কাশী, হরিদ্বার, তিরুপতি, মথুরা প্রভৃতি।

শিক্ষাকেন্দ্র: 

ভারতের প্রসিদ্ধ শিক্ষাকেন্দ্রগুলি অধিক ঘনবসতিপূর্ণ। যেমন- শান্তিনিকেতন, নালন্দা, আলিগড় প্রভৃতি।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: 

দিল্লি (ইন্দ্রপ্রস্থ), পাটনা (পাটলিপুত্র), গৌড়, কর্ণসুবর্ণ, বিজয়নগর, মহীশূর, আগ্রা প্রভৃতি শহরগুলির জনসংখ্যার অধিক ঘনত্ব ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট দ্বারাই প্রভাবিত।

D রাজনৈতিক কারণ: 

রাজনৈতিক পরিবেশ, সরকারি নীতি জনসংখ্যার বণ্টনে তারতম্য ঘটায়। যেমন- ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশ ও পাকিস্তান সীমান্তবর্তী অঞ্চলে জনসংখ্যার আধিক্য দেখা যায়। এ ছাড়া দেশের প্রশাসনিক কেন্দ্রগুলিতেও ঘনবসতি দেখা যায়। যেমন- দিল্লি, হায়দরাবাদ, কলকাতা প্রভৃতি।
আরও পড়ুন প্রয়োজনে
গ্রহরূপে পৃথিবী প্রশ্ন উত্তর নবম শ্রেণি ভূগোল | Grohorupe Prithibi Question Answer Class 9 Geography Click here
নবম শ্রেণি ভূগোল সাজেশন ২০২৬ | Class Nine Geography Suggestion 2026 Click here
Madhyamik Geography Suggestion 2025-2026 (Exclusive Suggestion) Click here
পশ্চিমবঙ্গের অর্থনৈতিক উন্নতিতে কলকাতা বন্দরের গুরুত্ব লেখো Click here

Leave a Comment