১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের বিদ্রোহের ব্যর্থতার কারণ

১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের বিদ্রোহের ব্যর্থতার কারণ

১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের বিদ্রোহের ব্যর্থতার কারণ
১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের বিদ্রোহের ব্যর্থতার কারণ

ঊনবিংশ শতকের গোড়া থেকেই ভারতে ইংরেজ কোম্পানির শাসনের প্রতিবাদে নানা অঞ্চলে আন্দোলন সংঘটিত হয়েছিল। কিন্তু ব্যাপ্তি ও গভীরতার বিচারে ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের বিদ্রোহ পূর্ববর্তী আন্দোলনগুলিকে ছাপিয়ে যায়। কিছুকালের জন্য হলেও মধ্য ও উত্তর ভারতের কিছু অংশে ব্রিটিশ শাসনের পরিবর্তে বিদ্রোহীদের শাসন কায়েম ছিল। বড়োলাট লর্ড ক্যানিং নিজেই এই ব্যর্থতার দায় স্বীকার করেছেন। কিন্তু শেষ পরিণতিতে বিদ্রোহ ব্যর্থ হয়। প্রবল জন উন্মাদনা ও প্রাণশক্তি সত্ত্বেও একাধিক ত্রুটি ও দুর্বলতা ১৮৫৭-র বিদ্রোহকে সফল হতে দেয়নি। যেমন-

(i) কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের অভাব: যে-কোনো বৃহৎ গণবিদ্রোহ সফল করার একটি পূর্বশর্ত হল সুদৃঢ় কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। কিন্তু ১৮৫৭-র বিদ্রোহে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের অভাব সঠিক পথে এবং পরিকল্পিত কর্মসূচি-সহ বিদ্রোহ পরিচালনায় বাধা সৃষ্টি করে। দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ-কে ভারত সম্রাট ঘোষণা করলেও, মূল ক্ষমতা ছিল কোর্ট অফ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বা জলসা-র উপর। নানাসাহেব, রানি লক্ষ্মীবাঈ প্রমুখ ব্যক্তিগতভাবে সাহসী ও দক্ষ হলেও, তাঁদের ভারতের নানা প্রান্ত থেকে আসা বিদ্রোহী সিপাহিদের নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা বা গ্রহণযোগ্যতা ছিল না।

অন্যদিকে, ইংরেজপক্ষে ক্যাম্পবেল (Colin Campbell), হিউ রোজ, আউট্রাম, নিকলসন প্রমুখ ছিলেন অত্যন্ত সাহসী ও সমরকুশলী নেতা। ফ্রেডারিক এঙ্গেলস লিখেছেন যে, ‘সিপাহিরা ব্যক্তিগতভাবে যথেষ্ট সাহসিকতার পরিচয় দিলেও তারা ছিলেন একেবারে নেতৃত্ববিহীন।’ এ ছাড়া হেনরি লরেন্সও স্বীকার করেছেন যে, বিদ্রোহী সিপাহিদের মধ্যে যদি একজনও প্রতিভাবান নেতা থাকত, তাহলে ইংরেজদের বিদ্রোহ দমনের চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যেত।

(ii) পরিকল্পনার অভাব: কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব না থাকার কারণে বিদ্রোহীরা পরিকল্পিতভাবে ব্রিটিশ বাহিনীর মোকাবিলা করতে ব্যর্থ হন। নানাসাহেব, লক্ষ্মীবাঈ, বখৎ খান, কুনওয়ার সিং প্রমুখ প্রায় সবাই নিজ নিজ আঞ্চলিক ক্ষেত্রের মধ্যেই তাঁদের লড়াই সীমাবদ্ধ রেখেছিলেন। স্বভাবতই অসংগঠিত, বিচ্ছিন্ন, বিক্ষিপ্ত বিদ্রোহীদের দমন করা ইংরেজদের পক্ষে সহজ হয়ে যায়।

(iii) উদ্দেশ্যের বিভিন্নতা: ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের বিদ্রোহী নেতাদের লক্ষ্য বা উদ্দেশ্যের মিল ছিল না। প্রায় সকলেই নিজ নিজ আঞ্চলিক স্বার্থে বিদ্রোহে নামেন। বাহাদুর শাহ-র লক্ষ্য ছিল ভারতব্যাপী মুঘল কর্তৃত্বের পুনঃপ্রতিষ্ঠা। নানাসাহেবের লক্ষ্য ছিল পেশওয়ার স্বাধীন কর্তৃত্ব ও মর্যাদা পুনরুদ্ধার করা। লক্ষ্মীবাঈ চেয়েছিলেন তাঁর ঝাঁসি রাজ্যের স্বাধীন ও সার্বভৌম ক্ষমতা অধিকার করতে। তাছাড়া একদিক থেকে বিচার করলে এঁদের উদ্দেশ্য পরস্পরবিরোধীও ছিল। যেমন- দিল্লিতে মুঘল কর্তৃত্ব স্থাপিত হলে নানাসাহেব বা লক্ষ্মীবাঈ-এর স্বাধীন আঞ্চলিক কর্তৃত্ব থাকতে পারে না। সম্ভবত এই স্বার্থ-সংঘাতের কারণে নেতৃবৃন্দ যৌথ কর্মসূচি দ্বারা বৃহত্তর যুদ্ধে নামতে দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন। কাজেই আঞ্চলিক স্তরে বিচ্ছিন্ন বিদ্রোহ দমন করা ইংরেজদের পক্ষে সহজ হয়ে যায়।

(iv) আঞ্চলিক সীমাবদ্ধতা: ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের বিদ্রোহ ভারতের সর্বত্র সম্প্রসারিত হয়নি; কেবলমাত্র দিল্লি, যুক্তপ্রদেশ, অযোধ্যা, বাংলা, বিহার প্রভৃতি অঞ্চলের মধ্যেই তা সীমাবদ্ধ ছিল। দক্ষিণ ভারত, কাশ্মীর, রাজপুতানা প্রভৃতি অঞ্চলে এই বিদ্রোহের কোনও প্রভাব পরিলক্ষিত হয়নি।

(v) অনুন্নত যুদ্ধ-সরঞ্জাম: উন্নতমানের অস্ত্রশস্ত্রের অভাব বিদ্রোহীদের ব্যর্থতার অন্যতম কারণ ছিল। বিদ্রোহী সিপাহিদের হাতে ছিল অনুন্নত গাদাবন্দুক, তরবারি, বর্শা ইত্যাদি সাধারণ অস্ত্রশস্ত্র। অন্যদিকে তাদের প্রতিপক্ষ ইংরেজ বাহিনীর অস্ত্রশস্ত্র ছিল আধুনিক রাইফেল, ভারী কামান, শক্তিশালী বোমা ইত্যাদি। স্বভাবতই এই অসম যুদ্ধে সিপাহিদের ব্যর্থতা ছিল অবশ্যম্ভাবী। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ক্রিমিয়ার যুদ্ধ শেষ হওয়ার ফলে ইউরোপ থেকে নতুন সেনাবাহিনী ভারতে প্রেরণ করা হয় বিদ্রোহ দমনের জন্য। আবার সিঙ্গাপুর থেকেও ইংরেজ সেনাবাহিনীর বহু সদস্যকে ভারতে ফিরিয়ে আনলে বিদ্রোহীরা পিছু হটতে বাধ্য হন।

(vi) রণকৌশলের ত্রুটি: নিজেদের শক্তি ও সামর্থ্যের ভিত্তিতে রণকৌশল অবলম্বনের কাজে বিদ্রোহীরা উদ্ভাবনী শক্তির পরিচয় দিতে পারেননি। বিদ্রোহীরা মূলত ব্রিটিশ বাহিনীর অনুকরণে বিশাল বাহিনী নিয়ে সম্মুখ যুদ্ধে নামেন। অত্যাধুনিক সামরিক সরঞ্জামে সমৃদ্ধ ব্রিটিশ বাহিনীর বিরুদ্ধে সম্মুখ যুদ্ধে নামা ছিল ভয়ানক আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। ব্রিটিশদের তুলনায় সৈন্যসংখ্যা ও অস্ত্রবলে পিছিয়ে থাকা বিদ্রোহী দেশীয় সিপাহিরা গেরিলা যুদ্ধ পদ্ধতি অনুসারে বিক্ষিপ্তভাবে গোপনে গোপনে আক্রমণ করলে বেশি সাফল্য পেতেন বলে ইংরেজ সামরিক অফিসার কলওয়েল (CE Collwell) মনে করেন। যদিও তাঁতিয়া তোপি, কুনওয়ার সিং ব্যক্তিগতভাবে গেরিলা যুদ্ধে নেমে ইংরেজদের যথেষ্ট বিব্রত করেছিলেন। কিন্তু এই বিচ্ছিন্ন প্রয়াস সাফল্যের জন্য যথেষ্ট ছিল না।

(vii) রাজনৈতিক চেতনার অভাব: উনবিংশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধের গোড়ায় সাধারণ ভারতবাসীর মধ্যে জাতীয় চেতনার উন্মেষ ঘটেনি। গবেষক সুপ্রকাশ রায় লিখেছেন যে, ‘বৈপ্লবিক আন্দোলন পরিচালনার উপযুক্ত আধুনিক মধ্যবিত্ত বা বুর্জোয়া শ্রেণি তখন ভারতে ছিল না।’ আন্দোলনের নেতৃত্ব ছিল সামন্ত-ভূস্বামী শ্রেণির হাতে। তারা নিজেদের আর্থিক স্বার্থে কৃষক ও শ্রমজীবী শ্রেণিকে বিদ্রোহে নিরাসক্ত রাখতে বেশি উদ্‌গ্রীব ছিলেন। অমলেন্দু দাশগুপ্ত তাঁর Our First National War প্রবন্ধে লিখেছেন, ‘ব্রিটিশ শক্তিকে প্রতিরোধের জন্য প্রয়োজন ছিল ব্যাপক গণচেতনা ও গণ অভ্যুত্থানের। কিন্তু সামন্ততান্ত্রিক নেতারা গ্রামীণ শ্রমজীবী শ্রেণিকে এই অভ্যুত্থানে শামিল করতে সাহসী হননি।’

(viii) দেশীয় শক্তির বিরোধিতা: ভারতের অনেক আঞ্চলিক রাজা, যেমন- গোয়ালিয়রের সিন্ধিয়া, ইন্দোরের হোলকার, হায়দরাবাদের নিজাম, রাজপুতানা, পাঞ্জাব এবং নেপালের রাজা-সহ অনেকে বিদ্রোহ দমনে ইংরেজদের সাহায্য করেছিলেন। তাছাড়া শিখ, রাজপুত, মারাঠা, গোর্খা প্রভৃতি যোদ্ধা জাতিও ইংরেজদের পক্ষ নিয়ে বিদ্রোহীদের দমন করেছিল। লর্ড ক্যানিং স্বীকার করেছেন যে, ভারতীয় শাসকদের সমর্থন না পেলে ইংরেজকে তল্পিতল্পা (Bags and Baggages)-সহ ভারত ছাড়তে হত।

(ix) বুদ্ধিজীবী শ্রেণির নির্লিপ্ততা: ভারতের বুদ্ধিজীবী শ্রেণি ১৮৫৭-র বিদ্রোহকে সমর্থন করেননি। তাঁদের একাংশ ইংরেজ শাসনের সুনজরে থেকে আর্থসামাজিক সুবিধা ভোগ করতে আগ্রহী ছিলেন। অপর অংশ মনে করতেন যে, বিদ্রোহীরা সফল হলে ভারতে পলাশির যুদ্ধের পূর্বেকার বিশৃঙ্খলা ফিরে আসবে। চরমপন্থী নেতা বিপিনচন্দ্র পাল লিখেছেন, সমকালীন বুদ্ধিজীবীরা বিশ্বাস করতেন যে বিদ্রোহীদের সাফল্য ভারতে প্রাক্-ব্রিটিশ অনধকারময় যুগকেই ফিরিয়ে আনবে যা তাদের কাম্য নয়।

(x) আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা: রেলপথ ও টেলিগ্রাফ ইত্যাদি আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থার উপর নিয়ন্ত্রণ ইংরেজ বাহিনীকে সাফল্যলাভে সাহায্য করেছিল। টেলিগ্রাফ-এর মাধ্যমে দ্রুত বিদ্রোহের সংবাদ সংগ্রহ এবং রেলপথে দ্রুত সৈন্যবাহিনী প্রেরণের সুবিধা ব্রিটিশ সরকারের সাফল্যের সহায়ক হয়েছিল।

(xi) মুঘল কর্মচারীদের বিশ্বাসঘাতকতা: Eighteen Fifty-Seven গ্রন্থে সুরেন্দ্রনাথ সেন উল্লেখ করেছেন যে, মহম্মদ আলি, কলি খাঁ প্রমুখ মুঘল সামরিক কর্মচারীরা গোপনে ইংরেজদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন এবং তাদের কাছে বিদ্রোহীদের গোপন সংবাদ সরবরাহ, বিদ্রোহীদের বিচ্ছিন্ন করা ইত্যাদি কাজে যুক্ত ছিলেন।

(xii) ব্রিটিশদের নির্মম অত্যাচার: ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের বিদ্রোহকে দমন করার জন্য ব্রিটিশ সরকার অত্যন্ত কঠোর নীতি গ্রহণ করে। মার্কস ও এঙ্গেলস-এর লেখা থেকে জানা যায়, পাশবিক নিষ্ঠুরতার যে দৃষ্টান্ত ইংরেজ সেনারা ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের বিদ্রোহ দমনের ক্ষেত্রে দেখিয়েছিলেন, তা ইউরোপ বা আমেরিকার কোনও বাহিনী কখনও দেখায়নি।

এই সমস্ত বিষয় ছাড়াও বিদ্রোহের সময় ভারতীয়দের ভীতি প্রদর্শন এবং প্রয়োজনে চাকুরি ও পুরস্কারের লোভ দেখিয়েও ব্রিটিশরা বিদ্রোহের গতি রুদ্ধ করার প্রয়াস চালিয়েছিলেন। ফলত আশা জাগিয়েও ১৮৫৭-র বিদ্রোহ শেষপর্যন্ত ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।

আরো পড়ুন : উচ্চমাধ্যমিক চতুর্থ সেমিস্টার দর্শন প্রশ্ন উত্তর

আরও পড়ুন প্রয়োজনে
বিপ্লবী আদর্শ নেপোলিয়নীয় সাম্রাজ্য ও জাতীয়তাবাদ প্রশ্ন উত্তর ক্লাস নাইন ইতিহাস | Class 9 History 2nd Chapter Question Answer Click here
নবম শ্রেণি ইতিহাস সাজেশন ২০২৬ | Class 9 History Suggestion 2026 Click here
দশম শ্রেণি ইতিহাস প্রথম অধ্যায় ইতিহাসের ধারণা প্রশ্ন উত্তর | Class 10 History First Chapter Question Answer Click here
Madhyamik History Suggestion 2025-2026 Click here

Leave a Comment