আরোহ অনুমানের স্বরূপ প্রশ্ন উত্তর (তৃতীয় অধ্যায়) | ক্লাস 12 চতুর্থ সেমিস্টার দর্শন

Table of Contents

আরোহ অনুমানের স্বরূপ প্রশ্ন উত্তর (তৃতীয় অধ্যায়) | ক্লাস 12 চতুর্থ সেমিস্টার দর্শন | HS 4th Semester Philosophy Aroho Onumaner Sworup Question answer 3rd Chapter

আরোহ অনুমানের স্বরূপ প্রশ্ন উত্তর
আরোহ অনুমানের স্বরূপ প্রশ্ন উত্তর

১। আরোহ অনুমানের সংজ্ঞা দাও। আরোহ অনুমানের বৈশিষ্ট্যগুলি আলোচনা করো।

আরোহ অনুমান: যে অনুমান প্রক্রিয়ায় বিশেষ বিশেষ দৃষ্টান্ত পর্যবেক্ষণ করে প্রকৃতির একরূপতা নীতি ও কার্যকারণ নিয়মের উপর ভিত্তি করে ব্যাপকতর একটি সামান্য সংশ্লেষক বচন প্রতিষ্ঠা করা হয়, সেই প্রক্রিয়াকে আরোহ অনুমান বলে।

আরোহ অনুমানের বৈশিষ্ট্য: উপরোক্ত সংজ্ঞা থেকে আরোহ অনুমানের কয়েকটি বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করা যায়। সেগুলি হল-

১) আরোহ অনুমানে কয়েকটি বিশেষ বিশেষ দৃষ্টান্ত বা ঘটনা পর্যবেক্ষণ বা পরীক্ষণ করে একটি সামান্য বচন প্রতিষ্ঠা করা হয়।

২) এই অনুমানের সিদ্ধান্তে প্রতিষ্ঠিত সামান্য বচনটি হল একটি সংশ্লেষক বচন।

৩) এখানে প্রকৃতির একরূপতা নীতি ও কার্যকারণ নিয়মের উপর ভিত্তি করে অনুমান করা হয়।

৪) আরোহ যুক্তিতে বিশেষ হেতুবাক্য থেকে সামান্য সিদ্ধান্ত অনুমান করা হয়।

৫) এই অনুমানে সিদ্ধান্তটি সর্বদাই একাধিক আশ্রয়বাক্য থেকে গৃহীত হয়।

৬) আরোহ যুক্তিতে সিদ্ধান্তটি হেতুবাক্যগুলি থেকে অনিবার্যভাবে নিঃসৃত হয় না।

৭) আরোহ অনুমানের সিদ্ধান্তটি হেতুবাক্যের থেকে ব্যাপকতর হয়।

৮) আরোহ যুক্তির সিদ্ধান্ত যেহেতু সংশ্লেষক বচন হয় অর্থাৎ সিদ্ধান্তে নতুনত্ব বা অতিরিক্ত তথ্য থাকে, তাই সিদ্ধান্ত সর্বদা সম্ভাবনামূলক হয়।

৯) আরোহ যুক্তির ভিত্তি পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষণের উপর নির্ভর করে। তাই বস্তুগতভাবে আরোহের সিদ্ধান্ত সত্য হয়।

১০) প্রত্যেক আরোহ অনুমানে একটি আরোহমূলক উল্লম্ফন (লাফ বা ঝুঁকি) থাকে।

২। আরোহ অনুমানের বিশেষ লক্ষণগুলি কী কী? ব্যাখ্যা করো।

আরোহ অনুমানকে অন্যান্য অনুমান থেকে পৃথক করার জন্য যুক্তিবিজ্ঞানীরা কয়েকটি বিশেষ লক্ষণ উল্লেখ করেছেন। এইগুলির মধ্যে তিনটি লক্ষণ প্রধান। এই লক্ষণ তিনটি হল- সামান্যীকরণ, হেতুবাক্য ও সিদ্ধান্তে হেতুবাক্যকে অতিক্রম করে যাওয়া এবং সিদ্ধান্তের মধ্যে প্রসক্তি সম্বন্ধের অভাব।

সামান্যীকরণ: আরোহ অনুমান হল একটি ‘সামান্যীকরণ প্রক্রিয়া’। আরোহ অনুমানে কয়েকটি বিশেষ বিশেষ বস্তু বা ঘটনা পর্যবেক্ষণ করে সেই জাতীয় সকল বস্তু বা ঘটনা সম্বন্ধে একটি সামান্য সংশ্লেষক বচন প্রতিষ্ঠা করা হয়।

উদাহরণ

লোহা গরম করলে প্রসারিত হয়।
তামা গরম করলে প্রসারিত হয়। অ্যালুমিনিয়াম গরম করলে প্রসারিত হয়। অতএব, সব ধাতু গরম করলে প্রসারিত হয়।

উপরোক্ত উদাহরণে কয়েকটি ধাতুকে পর্যবেক্ষণ করে সিদ্ধান্ত করা হয়েছে। কেন-না অভিজ্ঞতার দ্বারা সব ধাতুকে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব নয়। এইভাবে কয়েকটি ধাতুকে গরম করলে প্রসারিত হতে দেখে ‘সব ধাতু গরম করলে প্রসারিত হয়’ এইরূপ সিদ্ধান্ত করাই হল সামান্যীকরণ।

সিদ্ধান্তে হেতুবাক্যকে অতিক্রম কার যাওয়া: আরোহ অনুমানের একটি বিশেষ লক্ষণ হল ‘সিদ্ধান্তে হেতুবাক্যকে অতিক্রম করে যাওয়া।’

উদাহরণ

রাহুলের পিতা হন স্নেহশীল।
রিমির পিতা হন স্নেহশীল।
অজয়ের পিতা হন স্নেহশীল।
অতএব, সকল পিতা হন স্নেহশীল।

উপরোক্ত উদাহরণে রাহুল, রিমি ও অজয়-এই কয়েকজনের পিতাকে স্নেহশীল দেখে সিদ্ধান্ত করা হল সকল পিতা হন স্নেহশীল। এখানে আশ্রয়বাক্যে কয়েকজন পিতার উল্লেখ থাকলেও সিদ্ধান্তে সকল পিতার উল্লেখ থাকায় সিদ্ধান্তটি আশ্রয়বাক্যকে অতিক্রম করেছে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, আরোহ অনুমানে এইভাবে বিশেষ বিশেষ দৃষ্টান্ত পর্যবেক্ষণ করে সার্বিক সিদ্ধান্ত প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে একপ্রকার ঝুঁকি বা অনিশ্চয়তা থাকে। এই ঝুঁকিকে ‘আরোহমূলক লাফ বা ঝুঁকি’ বলা হয়।

হেতুবাক্য ও সিদ্ধান্তের মধ্যে প্রসন্তি সম্বন্ধের অভাব: আরোহ অনুমানের আরও একটি বিশেষ লক্ষণ হল, আরোহ অনুমানের ‘হেতুবাক্য ও সিদ্ধান্তের মধ্যে প্রসক্তি সম্বন্ধের অভাব’ থাকে। প্রসক্তি সম্বন্ধ হল দুটি বিষয়ের মধ্যে অনিবার্য সম্পর্ক। বৈধ অবরোহ যুক্তিতে হেতুবাক্য ও সিদ্ধান্তের মধ্যে প্রসক্তি সম্বন্ধ থাকে। এইজন্য অবরোহ যুক্তিতে সিদ্ধান্ত হেতুবাক্য থেকে অনিবার্যভাবে নিঃসৃত হয়। *৩ কিন্তু আরোহ অনুমানে হেতুবাক্য ও সিদ্ধান্তের মধ্যে কোনোরূপ প্রসক্তি সম্বন্ধ থাকে না। সিদ্ধান্তটি হেতুবাক্যকে অতিক্রম করে যায় বলে সিদ্ধান্তটি হেতুবাক্য থেকে অনিবার্যভাবে নিঃসৃত হয় না।

উদাহরণ

বনের পাখির ডানা আছে।
খাঁচার পাখির ডানা আছে।
পোষা পাখির ডানা আছে।
অতএব, সব পাখির ডানা আছে।

এক্ষেত্রে হেতুবাক্য সত্য হলে সিদ্ধান্ত মিথ্যা হতে পারে। কারণ হেতুবাক্য ও সিদ্ধান্তের মধ্যে অনেক অপর্যবেক্ষিত দৃষ্টান্ত থেকে যায়। তাই সিদ্ধান্তটি হেতুবাক্য থেকে অনিবার্যভাবে নিঃসৃত হতে পারে না।

৩। আরোহ অনুমানের মূল সমস্যা কী? কীভাবে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব?

আরোহ অনুমানের সমস্যা: আরোহ অনুমানের লক্ষ্য হল বিশেষ বিশেষ বস্তু বা ঘটনা পর্যবেক্ষণ করে একটি সামান্য সংশ্লেষক বচন গঠন করা এবং তার বস্তুগত সত্যতা প্রতিষ্ঠা করা।

উদাহরণ

রাম হয় মরণশীল।
শ্যাম হয় মরণশীল।
অজয় হয় মরণশীল।
অতএব, সকল মানুষ হয় মরণশীল।

উপরোক্ত আরোহ অনুমানে কয়েকজন মানুষের মৃত্যু পর্যবেক্ষণ করে ‘সকল মানুষ হয় মরণশীল’-এইরূপ বচনটির সত্যতা প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। আমাদের সীমিত অভিজ্ঞতায় আমরা কয়েকজন মানুষের মরণশীলতাকে পর্যবেক্ষণ করতে পারি। কিন্তু অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের সকল মানুষের মরণশীলতা পর্যবেক্ষণ করা কোনো মানুষের পক্ষেই সম্ভব নয়। কাজেই এক্ষেত্রে আমাদের দুটি সমস্যা বিশেষভাবে দেখা দেয় যা আরোহ অনুমানের মূল সমস্যা। সেগুলি হল-③ সীমিত অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে বা বিশেষ বিশেষ দৃষ্টান্তের ভিত্তিতে কীভাবে সামান্য সংশ্লেষক বচন গঠন করা যাবে? এবং কীভাবে এই সামান্য সংশ্লেষক বচনের বাস্তব সত্যতা প্রতিষ্ঠিত হবে?

আরোহ অনুমানের সমস্যার সমাধান: আরোহ অনুমানের সমস্যার সমাধানের জন্য যুক্তিবিজ্ঞানীগণ আরোহ অনুমানের দুটি মৌলিক নিয়ম বা নীতির উপস্থাপনা করেছেন। এই দুটি নিয়মের উপর ভিত্তি করেই আমরা আরোহ অনুমানে বিশেষ বিশেষ ঘটনা থেকে সামান্যে উপনীত হওয়ার সমস্যার সমাধান করতে পারি। এই নিয়ম দুটি হল- প্রকৃতির একরূপতা নীতি এবং ও কার্যকারণ নিয়ম।

(ক) প্রকৃতির একরূপতা নীতি: প্রকৃতির একরূপতা নীতির মূলকথা হল প্রকৃতি সম অবস্থায় সম আচরণ করে। এই নীতির উপর ভিত্তি করেই আরোহ অনুমানে সামান্যীকরণ সম্ভব হয়। এই নীতি অনুসারে আমরা বিশেষ কয়েকজন মানুষের মৃত্যু দেখে অনুমান করি যে ‘সকল মানুষ হয় মরণশীল’। কারণ আমরা বিশ্বাস করি যে একই অবস্থার পুনরাবৃত্তি ঘটলে প্রকৃতি একইরকমের আচরণ করবে। এই নিয়ম অনুসারে যে যে কারণের জন্য রাম, শ্যাম, অজয় প্রমুখের মৃত্যু অতীতে ঘটেছে, সেইসব কারণের পুনরাবৃত্তি ঘটলে ভবিষ্যতে সকল মানুষ অবশ্যই মারা যাবে।

(খ) কার্যকারণ নিয়ম : কার্যকারণ নিয়ম অনুসারে প্রতিটি ঘটনার কারণ আছে। এই নিয়মের ভিত্তিতেই আরোহ অনুমানে সামান্যীকরণ করা হয়। আরোহ অনুমানের সিদ্ধান্তে দুটি বিষয়ের মধ্যে যে সম্বধ স্বীকার করা হয় তা যদি কার্যকারণ নিয়মের উপর প্রতিষ্ঠিত হয় তবে সেটি সার্বিক ও আবশ্যিক হয়ে থাকে। একইভাবে ‘সকল মানুষ হয় মরণশীল’-এক্ষেত্রে মানুষ ও মরণশীলতার মধ্যে কার্যকারণ সম্বনধ বর্তমান রয়েছে। এই কার্যকারণ নিয়মের উপর ভিত্তি করেই আমরা কয়েকটি বিশেষ ক্ষেত্রে কয়েকজন মানুষের মৃত্যু পর্যবেক্ষণ করে ‘সকল মানুষ হয় মরণশীল’-এই সামান্য সংশ্লেষক বচনটি প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হই।

৪। আরোহ অনুমানের আকারগত ভিত্তি কী কী? আলোচনা করো।

আরোহ অনুমানের আকারগত ভিত্তি বলতে এমন মৌলিক নিয়মকে বোঝায় যেগুলির উপর নির্ভর করে আরোহ অনুমানের সিদ্ধান্ত স্থাপন করা হয়। আরোহ অনুমানের আকারগত ভিত্তি দুটি। যথা- প্রকৃতির একরূপতা নীতি এবংও কার্যকারণ নিয়ম।

প্রকৃতির একরূপতা নীতি : প্রকৃতি হল নিয়মের রাজত্বের অধীন। প্রকৃতি রাজ্যে আকস্মিকভাবে কোনো ঘটনা ঘটতে পারে না। প্রকৃতির সকল ঘটনাই একটি নির্দিষ্ট নিয়ম অনুসারে ঘটে। প্রকৃতির একরূপতা নীতির মূলকথা হল-প্রকৃতি সম অবস্থায় সম আচরণ করে। যে পরিস্থিতিতে প্রকৃতিতে কোনো ঘটনা একবার ঘটে, অনুরূপ পরিস্থিতিতে আবারও সেই ঘটনা একইরকমভাবে ঘটবে। যে অবস্থায় বা পরিস্থিতিতে কোথাও ভূমিকম্প হয়েছিল, সেই একই অবস্থা বা পরিস্থিতির যদি পুনরাবৃত্তি হয় তবে ভবিষ্যতেও ভূমিকম্প হবে। এর কোনো ব্যতিক্রম হবে না-এটিই হল প্রকৃতির একরূপতা নীতির মূল বৈশিষ্ট্য। এই নীতির উপর আস্থা রেখে আরোহ অনুমানের গঠন বা সামান্য আকার প্রতিষ্ঠিত হয় বলে প্রকৃতির একরূপতা নীতিকে আরোহ অনুমানের আকারগত ভিত্তি বলা হয়।

কার্যকারণ নিয়ম: কার্যকারণ নিয়ম অনুসারে জগতের প্রত্যেকটি কার্যের একটি সুনির্দিষ্ট কারণ আছে। বৈচিত্র্যময় জগতে শূন্য থেকে কোনো কিছুর সৃষ্টি হতে পারে না। প্রত্যেকটি ঘটনার কোনো-না-কোনো কারণ আছে। অভিজ্ঞতায় বারবার দুটি ঘটনাকে একসঙ্গে ঘটতে দেখে ওই দুটি ঘটনার মধ্যে কার্যকারণ সম্বধ আছে বলে মনে করা হয়। এর মধ্যে পূর্ববর্তী ঘটনাটিকে কারণ এবং পরবর্তী ঘটনাটিকে কার্য বলে। যেমন-আগুন হল দহন ক্রিয়ার কারণ। এখানে আগুন হল কারণ এবং দহন ক্রিয়া হল কার্য। কার্যকারণ নিয়ম অনুসারে এক্ষেত্রে ‘আগুন’ এবং ‘দহন ক্রিয়া’-র মধ্যে কার্যকারণ সম্বব আছে বলে মনে করা হয়। এই কার্যকারণ নিয়মের ভিত্তিতেই আরোহ অনুমানের সামান্যীকরণ করা হয় বলে কার্যকারণ নিয়মকে আরোহ অনুমানের আকারগত ভিত্তি বলা হয়।

৫। আরোহ অনুমানের ভিত্তি হিসেবে প্রকৃতির একরূপতা নীতিকে ব্যাখ্যা করো।

আরোহ অনুমানের সিদ্ধান্ত যে দুটি মূল নীতির উপর প্রতিষ্ঠিত তার মধ্যে অন্যতম হল প্রকৃতির একরূপতা নীতি। এই নীতি হল চিন্তার এক মৌলিক সূত্র যা মূলত স্বতঃসিদ্ধ। এই নীতিটিকে বিভিন্ন ভাষায় প্রকাশ করা যায়। যেমন— প্রকৃতি সর্বদা একইরকম আচরণ করে, প্রকৃতি নির্দিষ্ট নিয়মের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়, প্রকৃতিতে রয়েছে নিয়মের অপরিবর্তনশীলতা অর্থাৎ নিয়মের কোনো ব্যতিক্রম নেই, ও ভবিষ্যৎ ও অতীত একই নিয়মে চলবে ইত্যাদি। এইসব বর্ণনার মধ্যে দিয়ে যে মূলকথাটি প্রকাশ পায়, তা হল প্রকৃতি সম অবস্থায় সম আচরণ করে। অর্থাৎ বৈচিত্র্যময় এই প্রকৃতিতে এক নিয়মশৃঙ্খলা কাজ করে। জগতের কোনো ঘটনাই আকস্মিক নয়। কোনো অবস্থায় প্রকৃতিতে যে ঘটনা ঘটে সেই অবস্থার পুনরাবৃত্তি ঘটলে ওই ঘটনাটি একইভাবে ঘটবে। যেমন-যে অবস্থায় জল অতীতে মানুষের তৃষ্ণা নিবারণ করেছে, সেই একই অবস্থার পুনরাবৃত্তি হলে জল ভবিষ্যতেও মানুষের তৃষ্ণা নিবারণ করবে।

আকারগত ভিত্তি হিসেবে প্রকৃতির একরূপতা নীতি: প্রকৃতির একরূপতা নীতির উপর ভিত্তি করে আরোহ অনুমানে সামান্য সংশ্লেষক বচন প্রতিষ্ঠা করা হয়। এই নীতি অনুসারে কিছু মানুষের মৃত্যু দেখে অনুমান করা হয় যে ‘সকল মানুষ হয় মরণশীল’। কারণ এ কথা বিশ্বাস করা হয় যে, একই অবস্থার পুনরাবৃত্তি ঘটলে প্রকৃতি একই রকমের আচরণ করবে। যে যে কারণের জন্য রাম, শ্যাম, যদু, মধু প্রমুখের মৃত্যু অতীতে ঘটেছে, সেইসব কারণের পুনরাবৃত্তি ঘটলে ভবিষ্যতেও সকল মানুষেরই মৃত্যু হবে। এইভাবে প্রকৃতির একরূপতা নীতির উপর আস্থা রেখে আরোহ অনুমানের গঠন বা সামান্য আকার প্রতিষ্ঠিত হয়। এইজন্যই প্রকৃতির একরূপতা নীতিকে আরোহ অনুমানের আকারগত ভিত্তি বলা হয়।

প্রকৃতির বৈচিত্র্য ও একরূপতা নীতি: প্রকৃতি বৈচিত্র্যময়। প্রকৃতি যেমন নিয়মের অধীন তেমনই এই নিয়মের ব্যতিক্রমও রয়েছে। প্রকৃতির বৈচিত্র্যের দিকে তাকালে মনে হয় যেন প্রকৃতির মধ্যে কোনো একরূপতা নেই। যেমন- আবহাওয়ার কথা নিশ্চিত করে কিছুই বলা যায় না। যুক্তিবিদ মিল তাই বলেছেন যে প্রকৃতি কেবল একরূপ নয়, প্রকৃতি বৈচিত্র্যপূর্ণ।

কিন্তু প্রকৃতির এই বৈচিত্র্য তার একরূপতা নীতিকে অপ্রমাণ করে না। প্রকৃতির একরূপতার অর্থ হল প্রকৃতি অনুরূপ অবস্থায় অনুরূপ আচরণ করে। যে অবস্থায় আজ যে ঘটনা ঘটেছে অনুরূপ অবস্থার পুনরাবৃত্তি হলে ভবিষ্যতেও আবার অনুরূপ ঘটনাটি ঘটবে।

৬। আরোহ অনুমানের ভিত্তি হিসেবে কার্যকারণ নিয়মকে ব্যাখ্যা করো।

কার্যকারণ নিয়ম অনুসারে বলা হয় যে প্রতিটি ঘটনারই কারণ আছে। প্রকৃতিতে কোনো ঘটনা বিনা কারণে ঘটে না বা শূন্য থেকে কোনো কিছুর উৎপত্তি হয় না। যুক্তিবিদ অ্যারিস্টট্ল-এর মতে ‘শূন্য থেকে শূন্যেরই সৃষ্টি হয়’। অনুরূপভাবে যুক্তিবিদ মিল বলেছেন যার উৎপত্তি আছে তার কারণও আছে। সুতরাং জগতের প্রত্যেকটি ঘটনারই কোনো-না-কোনো কারণ আছে। অভিজ্ঞতায় বারবার দুটি ঘটনাকে ঘটতে দেখে ওই হয়। এর মধ্যে পূর্ববর্তী ঘটনাকে কারণ এবং পরবর্তী ঘটনাকে কার্য বলা হয়। তবে এক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে, একই কারণ সর্বদা একই কার্য ঘটায়, কোনো অবস্থাতেই ভিন্ন সময়ে ভিন্ন কার্য উৎপন্ন করে না। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় তিল থেকে সবসময়ই তেল উৎপন্ন হয়। কোনো সময়ে তা জল উৎপন্ন করে না। অর্থাৎ নির্দিষ্ট কারণ নির্দিষ্ট কার্যই উৎপন্ন করে বা ওই নির্দিষ্ট কারণটি না ঘটলে নির্দিষ্ট কার্যটি ঘটে না। এটি হল কারণ ও কার্যের আবশ্যিক সম্পর্ক।

দুটি ঘটনার মধ্যে কার্যকারণ সম্বন্ধ আছে বলে মনে করা আকারগত ভিত্তি হিসেবে কার্যকারণ নিয়ম: কার্যকারণ নিয়মকে আরোহ অনুমানের আকারগত ভিত্তি বলা হয়। কারণ এই নিয়মের ভিত্তিতেই আরোহ অনুমানে সামান্যীকরণ করা হয়। আরোহ

অনুমানের সিদ্ধান্তে দুটি বিষয়ের মধ্যে যে সম্বধ স্বীকার করা হয়, সেটি যদি কার্যকারণ নিয়মের উপর প্রতিষ্ঠিত হয় তবে তা সার্বিক ও আবশ্যিক হয়। যেমন- ‘সকল মানুষ হয় মরণশীল জীব’-এক্ষেত্রে কার্যকারণ নিয়ম অনুসারে বলা হয় যে ‘মানুষ’ এবং ‘মরণশীলতা’-র মধ্যে কার্যকারণ সম্বন্ধ আছে। অর্থাৎ যেখানে মানুষ সেখানেই মরণশীলতা। এই কার্যকারণ নিয়মের উপর ভিত্তি করেই কয়েকটি বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে মানুষের মৃত্যু পর্যবেক্ষণ করে ‘সকল মানুষ হয় মরণশীল’ এই সামান্য সংশ্লেষক বচনটি প্রতিষ্ঠা করা হয়।

৭। আরোহ অনুমানের বস্তুগত ভিত্তি কী কী? আলোচনা করো।

আরোহ অনুমানের বস্তুগত ভিত্তি বলতে এমন প্রক্রিয়াকে বোঝায় যা আরোহ অনুমানের আশ্রয়বাক্যগুলিকে সরবরাহ করে এবং সিদ্ধান্তের বস্তুগত সত্যতার নিশ্চয়তা প্রদান করে। আরোহ অনুমানের বস্তুগত ভিত্তি হল দুটি। যথা পর্যবেক্ষণ এবং পরীক্ষণ।

পর্যাবক্ষণ: কোনো প্রাকৃতিক ঘটনা বা বিষয়কে বিশেষ কোনো উদ্দেশ্য নিয়ে প্রাকৃতিক পরিবেশে সুনিয়ন্ত্রিতভাবে প্রত্যক্ষ করাই হল পর্যবেক্ষণ। পর্যবেক্ষণের ক্ষেত্রে আমাদের প্রত্যক্ষের বিষয়টি নির্বাচন করতে হয় এবং অপ্রাসঙ্গিক বিষয়কে বর্জন করা হয়। এই পদ্ধতিতে আমাদের প্রকৃতির উপর নির্ভর করতে হয়। কেন-না প্রকৃতিই আমাদের সামনে পর্যবেক্ষণের বিষয়বস্তুটি উপস্থাপিত করে। সুতরাং পর্যবেক্ষণের মূল বৈশিষ্ট্য হল উদ্দেশ্যমূলক, সুনিয়ন্ত্রিত, নির্বাচন মূলক এবং প্রকৃতিনির্ভর।।

পরীক্ষণ: যখন কোনো কৃত্রিম পরিবেশে কোনো বিষয় বা ঘটনাকে সুসংগঠিত ও সুনিয়ন্ত্রিতভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয় তখন তাকে বলে পরীক্ষণ। কোনো বিষয় বা ঘটনা সম্বন্ধে সুনিশ্চিত সিদ্ধান্তে উপনীত হতে গেলে সেই বিষয়টিকে বারবার পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন হয়। কিন্তু প্রাকৃতিক পরিবেশে তা সম্ভব হয় না বলে কৃত্রিমভাবে ওইরূপ পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়। এইজন্য পরীক্ষণের ক্ষেত্রে আমাদের প্রকৃতির উপর নির্ভর করতে হয় না। সুতরাং পরীক্ষণের মূল বৈশিষ্ট্য হল উদ্দেশ্যমূলক সুনিয়ন্ত্রিত, নির্বাচনমূলক এবং কৃত্রিম পরিবেশ।

৮। পর্যবেক্ষণ কী? এর বৈশিষ্ট্যগুলি আলোচনা করো।

পর্যবেক্ষণ: কোনো একটি বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে প্রাকৃতিক পরিবেশে কোনো প্রাকৃতিক ঘটনাকে সুনিয়ন্ত্রিতভাবে প্রত্যক্ষ করাই হল পর্যবেক্ষণ। আরোহ অনুমানে বিশেষ বিশেষ ঘটনা লক্ষ করা হয়ে থাকে। এই বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে ঘটনাগুলিকে প্রত্যক্ষ করাই হল পর্যবেক্ষণ। পর্যবেক্ষণের উপর নির্ভর করে আরোহ অনুমানের আশ্রয়বাক্যগুলির উপাদান সংগ্রহ করা হয় এবং সিদ্ধান্তের বস্তুগত সত্যতার নিশ্চয়তা প্রদান করা হয় বলে পর্যবেক্ষণকে আরোহ অনুমানের বস্তুগত ভিত্তি বলা হয়।

পর্যবেক্ষণের বৈশিষ্ট্য: পর্যবেক্ষণের কয়েকটি বৈশিষ্ট্য হল –

উদ্দেশ্যমূলক: পর্যবেক্ষণ হল উদ্দেশ্যমূলক। কোনো একটি বিশেষ উদ্দেশ্য দ্বারা চালিত হয়েই আমরা কোনো প্রাকৃতিক ঘটনাকে। পর্যবেক্ষণ করে থাকি। এই উদ্দেশ্যটি হল বৈজ্ঞানিক জ্ঞানলাভ।

নির্বাচনমূলক: পর্যবেক্ষণ হল নির্বাচনমূলক। পর্যবেক্ষণের জন কোনো বিশেষ ঘটনাকে বেছে নিয়ে অর্থাৎ অন্যান্য ঘটনাগুলি থেকে বিচ্ছিন্ন করে নিয়ে তার প্রতি মনোযোগ দেওয়া হয়।

প্রকৃতি নির্ভর: পর্যবেক্ষণ হল প্রকৃতিনির্ভর। পর্যবেক্ষণের বিষয়গুলি সবই প্রকৃতিনির্ভর অর্থাৎ এগুলি সবই প্রাকৃতিক ঘটনা। প্রকৃতির জগতে প্রাকৃতিক ঘটনাগুলি যেভাবে ঘটেছে ঠিক সেইভাবেই তাদের পর্যবেক্ষণ করতে হয়। তবে পর্যবেক্ষণে সবই প্রাকৃতিক হলেও অনেকসময় কেবল ইন্দ্রিয়ের উপর নির্ভর না করে, কৃত্রিম যন্ত্রপাতি ও অনুবীক্ষণ যন্ত্র প্রভৃতির সাহায্য গ্রহণ করে কিছু জিনিস প্রত্যক্ষ করা হয়।

সুনিয়ন্ত্রিত: পর্যবেক্ষণকে হতে হয় সুনিয়ন্ত্রিত। কারণ অনিয়ন্ত্রিত বা এলোমেলো পর্যবেক্ষণের ফলে কোনো উপযুক্ত সিদ্ধান্তে আসা যায় না। সুনিয়ন্ত্রিত পর্যবেক্ষণকেই বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ বলা হয়।

৯। পরীক্ষণ কী? এর বৈশিষ্ট্যগুলি আলোচনা করো।

পরীক্ষণ: নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে পর্যবেক্ষণ করাই হল পরীক্ষণ। যখন কোনো ঘটনাকে বৈজ্ঞানিক লক্ষ্য পূরণের উদ্দেশ্যে কৃত্রিমভাবে ঘটানো হয় এবং সেই ঘটনাকে পর্যবেক্ষণ করা হয় তখন সেই প্রক্রিয়াকে পরীক্ষণ বলে। আরোহ অনুমানে অনেকসময় বিশেষ বিশেষ ঘটনাগুলিকে নিয়ন্ত্রিত অবস্থার মধ্যে পর্যবেক্ষণ করে সংগ্রহ করা হয়। পরীক্ষণের ক্ষেত্রে আমরা ঘটনাগুলিকে কৃত্রিমভাবে সৃষ্টি করি। যেমন- একজন সাধারণ মানুষ যখন বৃষ্টির জল দেখে তখন তাকে পর্যবেক্ষণ বলা হয়। কিন্তু একজন বৈজ্ঞানিক যখন পরীক্ষাগারে নির্দিষ্ট পরিমাণে অক্সিজেন ও হাইড্রোজেন মিশ্রিত করে জল তৈরি করে তা পর্যবেক্ষণ করেন, তখন তাকে পরীক্ষণ বলা হয়। পরীক্ষণকে অনেকে নিয়ন্ত্রিত পর্যবেক্ষণও বলেছেন।

পরীক্ষণের বৈশিষ্ট্য: পরীক্ষণের উল্লেখযোগ্য কয়েকটি বৈশিষ্ট্য হল—

উদ্দেশ্যমূলক: পরীক্ষণকেও পর্যবেক্ষণের মতো উদ্দেশ্যমূলক হতে হবে। কোনো একটি উদ্দেশ্য সাধনের জন্যই আমরা কোনো বিষয়কে পরীক্ষা করে থাকি। এটি পরীক্ষণের মূল বৈশিষ্ট্য।

কৃত্রিম পরিবেশ : পরীক্ষণের ক্ষেত্রে কৃত্রিম পরিবেশ হল প্রধান বৈশিষ্ট্য। কোনো বিষয় সম্পর্কে যথাযথ জ্ঞান লাভ করতে গেলে তাকে সুনিয়ন্ত্রিতভাবে বারবার পর্যবেক্ষণ করতে হয়- যা স্বাভাবিক পরিবেশে সম্ভব নয়।

বিচারবিশ্লেষণ: কোনো বিষয়কে কৃত্রিম পরিবেশে সুনিয়ন্ত্রিতভাবে বারবার প্রত্যক্ষ করে, সেটিকে বিচারবিশ্লেষণ করে আমরা একটি সুচিন্তিত ও সুনিয়ন্ত্রিত সিদ্ধান্তে পৌঁছোতে পারি। এটি পরীক্ষণের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য।

১০। আরোহ অনুমানের শ্রেণিবিভাগ করো। প্রত্যেক প্রকার আরোহ অনুমানের একটি করে উদাহরণ দাও।

জন স্টুয়ার্ট মিল আরোহ অনুমানকে দুই ভাগে ভাগ করেছেন। সেগুলি হল— তথাকথিত আরোহ অনুমান এবং প্রকৃত আরোহ অনুমান।

(১) তথাকথিত আরোহ অনুমান: তথাকথিত আরোহ অনুমানকে আবার তিন ভাগে ভাগ করা হয়। সেগুলি হল-

(ক) পূর্ণগণনামূলক আরোহ অনুমান: পূর্ণগণনামূলক আরোহ অনুমানের উদাহরণ হল-

উদাহরণ

এই ঝুড়ির আমগুলি হয় মিষ্টি।
এই ঝুড়ির কাঁঠালগুলি হয় মিষ্টি।
এই ঝুড়ির লিচুগুলি হয় মিষ্টি।
অতএব, এই ঝুড়ির সব ফল হয় মিষ্টি।

(খ) যুক্তিসাদৃশ্যমূলক আরোহ অনুমান: যুক্তিসাদৃশ্যমূলক আরোহ অনুমানের উদাহরণ হল-একটি ত্রিভুজ অঙ্কন করে প্রমাণ করা হল যে এর তিন কোণের সমষ্টি দুই সমকোণের সমান। তারপর এই সত্যকে অন্যান্য ত্রিভুজের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করে বলা হয় ‘সকল ত্রিভুজের তিন কোণের সমষ্টি দুই সমকোণের সমান।’

(গ) ঘটনা-সংযোজক আরোহ অনুমান: ঘটনা-সংযোজক আরোহ অনুমানের উদাহরণ হল-কোনো এক নাবিক সমুদ্রের মাঝে ভূমিখণ্ড দেখতে পেয়ে বুঝতে পারল না যে সেটি দ্বীপ নাকি দেশ। তখন ওই নাবিক সেই ভূমিখণ্ডটির চারপাশে ঘুরতে শুরু করল এবং কয়েকদিন পরে সে দেখল যে-সে যেখান থেকে যাত্রা শুরু করেছিল সেখানে ফিরে এসেছে। এর থেকে সে অনুমান করল যে ভূমিখণ্ডটি একটি দ্বীপ।

(২) প্রকৃত আরোহ অনুমান: প্রকৃত আরোহ অনুমানকে আবার তিন ভাগে ভাগ করা হয়। সেগুলি হল-

(ক) বৈজ্ঞানিক আরোহ অনুমান: বৈজ্ঞানিক আরোহ অনুমানের উদাহরণ হল-

উদাহরণ

সুজয় পরিশ্রমী এবং সফল।
অনিক পরিশ্রমী এবং সফল।
আব্রাহাম পরিশ্রমী এবং সফল।
অতএব, সব পরিশ্রমী ব্যক্তি হয় সফল।

(খ) অবৈজ্ঞানিক আরোহ অনুমান: অবৈজ্ঞানিক আরোহ অনুমানের উদাহরণ হল-

উদাহরণ

যত কাক দেখেছি তাদের সবকটি কালো।
(আজ পর্যন্ত অন্য কোনো রঙের কাক দেখিনি)
অতএব, সব কাক হয় কালো।

(গ) উপমাযুক্তি বা সাদৃশ্যমূলক আরোহ অনুমান: উপমাযুক্তি বা সাদৃশ্যমূলক আরোহ অনুমানের উদাহরণ হল—

উদাহরণ

পৃথিবী, মঙ্গল, বুধ ও বৃহস্পতি এরা সবাই গ্রহ এবং সূর্যের চারিদিকে ঘোরে।
পৃথিবী, মঙ্গল এবং বুধে জীবের অস্তিত্ব আছে।
অতএব, বৃহস্পতিতেও জীবের অস্তিত্ব আছে।

১১। পূর্ণগণনামূলক আবোহ অনুমান সবিচার আলোচনা করো।

পূর্ণগণনামূলক আরোহ অনুমান: যে অনুমানে কোনো শ্রেণির অন্তর্গত প্রত্যেকটি দৃষ্টান্তকে আলাদা আলাদাভাবে পর্যবেক্ষণ বা পরীক্ষণ করে সেইগুলি সম্পর্কে একটি সামান্য বচন প্রতিষ্ঠা করা হয় তাকে পূর্ণগণনামূলক আরোহ অনুমান বলে। যেমন-একটি ক্লাসের সব ছাত্রছাত্রীকে পরীক্ষা করে দেখা গেল যে সবাই মেধাবী। এর থেকে যে সামান্য বচনটি প্রতিষ্ঠা করা হয় তা হল ‘এই ক্লাসের সকল ছাত্রছাত্রী হয় মেধাবী’। অনেক যুক্তিবিজ্ঞানীরা এই প্রকার অনুমানকে নির্দোষ আরোহ অনুমান বলেছেন। কারণ এই অনুমানের ক্ষেত্রে কয়েকটি বিশেষ দৃষ্টান্তকে পর্যবেক্ষণ বা পরীক্ষণ করে সিদ্ধান্তে পৌঁছোনো হয়। আর তাই এই অনুমানের সিদ্ধান্ত কখনও ভ্রান্ত হয় না। এ ছাড়াও তর্কবিজ্ঞানী জনসন পূর্ণগণনামূলক আরোহ অনুমানকে সংক্ষিপ্তসার আরোহ অনুমান বলেও উল্লেখ করেছেন। কারণ এই অনুমান আমাদের অভিজ্ঞতায় পাওয়া বিশেষ বিশেষ বচনের সংক্ষিপ্ত রূপ।

সমালোচনা:

পূর্ণগণনামূলক আরোহ অনুমানকে প্রকৃত অনুমান বলা যায় না। সমালোচকদের মতে এই প্রকার অনুমানের যেসব ত্রুটি বর্তমান সেগুলি হল –

প্রথমত : পূর্ণগণনামূলক আরোহ অনুমানে জ্ঞাত সত্য থেকে অজ্ঞাত সত্যে উপনীত হওয়া, সিদ্ধান্তে আশ্রয়বাক্যের সাক্ষ্যপ্রমাণকে অতিক্রম করে যাওয়া অর্থাৎ ‘আরোহ অনুমান সংক্রান্ত লাফ’- আরোহ অনুমানের এই বৈশিষ্ট্যগুলি এই ক্ষেত্রে অনুপস্থিত থাকে।

দ্বিতীয়ত : এক্ষেত্রে সিদ্ধান্তে যে সামান্য বচনটি পাওয়া যায় তা গঠনের দিক থেকে একটি সামান্য বচন হলেও প্রকৃতিতে কতকগুলি বিশেষ বচনের সমষ্টিমাত্র।

তৃতীয়ত : এই প্রকার অনুমানের যে সিদ্ধান্তটি প্রতিষ্ঠিত হয় সেখানে উদ্দেশ্য ও বিধেয়ের মধ্যে কোনো কার্যকারণ সম্বন্ধ থাকে না। তাই এই অনুমান যে কার্যকারণ সম্বন্ধের উপর প্রতিষ্ঠিত- এমন কথা বলা যায় না।

আরো পড়ুন : রাষ্ট্রের প্রকৃতি – একাদশ শ্রেণির ইতিহাস প্রথম অধ্যায় প্রশ্ন উত্তর

Leave a Comment