দশম শ্রেণি ইতিহাস প্রথম অধ্যায় ইতিহাসের ধারণা প্রশ্ন উত্তর | Class 10 History First Chapter Question Answer

বোর্ড : বিষয়বস্তু

দশম শ্রেণি ইতিহাস প্রথম অধ্যায় ইতিহাসের ধারণা প্রশ্ন উত্তর | Class 10 History First Chapter Question Answer

দশম শ্রেণি ইতিহাস প্রথম অধ্যায় ইতিহাসের ধারণা প্রশ্ন উত্তর
দশম শ্রেণি ইতিহাস প্রথম অধ্যায় ইতিহাসের ধারণা প্রশ্ন উত্তর

১। আধুনিক ভারতের ইতিহাসের উপাদান হিসেবে বিপিনচন্দ্র পালের লেখা আত্মজীবনী ‘সত্তর বৎসর’-এর গুরুত্ব কী?

অথবা, আধুনিক ইতিহাসচর্চার উপাদান হিসেবে ‘সত্তর বৎসর’ সম্পর্কে আলোচনা করো।

ইতিহাসের উপাদান হিসেবে ‘সত্তর বৎসর’

ভূমিকা: আধুনিক ভারতের ইতিহাসের অন্যতম উপাদান হল বিভিন্ন ব্যক্তির আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা। রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক ও সমাজসংস্কারক বিপিনচন্দ্র পালের লেখা আত্মজীবনী ‘সত্তর বৎসর’ আধুনিক ভারতের ইতিহাস রচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে বিবেচিত হয়।

[1] ইতিহাসের উপাদান: বিপিনচন্দ্র পালের আত্মজীবনী ‘সত্তর বৎসর’ আধুনিক বাংলার নানা ঐতিহাসিক তথ্যে সমৃদ্ধ। গ্রন্থটি সম্পর্কে বিপিনচন্দ্র নিজেই লিখেছেন, “….আমার সত্তর বৎসরের জীবনকথা বাস্তবিক এই বাংলাদেশের আধুনিক ইতিহাসের কথা।’

[2] প্রথম জীবনের তথ্য: ‘সত্তর বৎসর’ গ্রন্থের শুরুতে বিপিনচন্দ্রের প্রথম জীবনের বিভিন্ন তথ্য, যেমন-শ্রীহট্ট জেলার পৈল গ্রামে তাঁর জন্ম, তাঁর বংশ ও গ্রামের পরিচয়, শৈশবে শ্রীহট্ট জেলার নানা ঘটনা, স্কুলের পড়াশোনার পর কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়াশোনা করতে আসা প্রভৃতি বিভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়।

[3] রাজনৈতিক জীবনের সূচনা: ‘সত্তর বৎসর’ গ্রন্থে বিপিনচন্দ্র পালের রাজনৈতিক জীবনের প্রথম পর্বের বিভিন্ন তথ্যেরও উল্লেখ আছে। কলকাতায় এসে জাতীয় নেতা আনন্দমোহন বসু ও সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা, ব্রাহ্মসমাজে যোগদান, শিবনাথ শাস্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ, স্বাধীনতা আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়া প্রভৃতি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বিপিনচন্দ্র তাঁর এই গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন।

[4] পরিণত জীবনের তথ্য: বিপিনচন্দ্র পাল পরিণত বয়সে যখন কংগ্রেসের নেতৃত্বে উঠে আসেন সেসময়ের বিভিন্ন তথ্যাদি তাঁর আত্মজীবনীতে উঠে এসেছে। পুরোনো কলকাতার কথা, ব্রাহ্মসমাজের ইতিহাস, ধর্মভীরু বাঙালির জাতীয়তাবাদী মানসিকতা, স্বদেশি, বয়কট ও পূর্ণ স্বরাজের দাবিতে আন্দোলন প্রভৃতির নানা দিকের আলোচনা তাঁর গ্রন্থে স্থান পেয়েছে।

উপসংহার: বিপিনচন্দ্র পাল তাঁর ‘সত্তর বৎসর’ নামক আত্মজীবনীতে যে স্মৃতি রোমন্থন করেছেন তার মধ্য দিয়ে উঠে এসেছে এক ব্যক্তিনিরপেক্ষ সমাজদর্শন। সমকালীন সময়ের রাজনৈতিক ও সামাজিক অবস্থা প্রকটভাবে ধরা পড়েছে তাঁর এই গ্রন্থটিতে।

২। আধুনিক ভারতের ইতিহাসের উপাদান হিসেবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা আত্মজীবনী ‘জীবনস্মৃতি’-এর গুরুত্ব কী?

অথবা, টীকা লেখো: কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘জীবনস্মৃতি’।

ইতিহাসের উপাদান হিসেবে ‘জীবনস্মৃতি’

ভূমিকা: আধুনিক ভারতের ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হল বিভিন্ন ব্যক্তির লেখা আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা। এক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা আত্মজীবনী ‘জীবনস্মৃতি’ আধুনিক ভারতের ইতিহাসের উপাদান হিসেবে বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে।

[1] বাঙালির স্বাদেশিকতা: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘জীবনস্মৃতি’ গ্রন্থে ঔপনিবেশিক বাংলার, বিশেষ করে কলকাতার ধনী পরিবারগুলির জীবনযাত্রার আভাস দিয়েছেন। এ যুগে অভিজাত বাঙালি পরিবারের বিভিন্ন বিদেশি প্রথার প্রচলন শুর হলেও স্বদেশের প্রতি অনুরাগও জাগ্রত ছিল। তাঁরা সন্তানদের শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে ইংরেজি ভাষা এবং পাশ্চাত্যশিক্ষাকে অগ্রাধিকার দিলেও বাংলা ভাষা ও শিক্ষার প্রতি অনুরাগও লক্ষ করা যায়।

[2] ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহল: ‘জীবনস্মৃতি’ গ্রন্থে ঠাকুর বাড়ির অন্দরমহলে বৃহৎ পরিবার, শিশুদের বাল্যকাল, নারীদের স্বাধীনতা প্রভৃতি বিভিন্ন ঘটনার ছবি তুলে ধরা হয়েছে। এগুলি থেকে সমকালীন বাংলার সামাজিক ইতিহাসের নানা তথ্য পাওয়া যায়। তিনি লিখেছেন, “আমাদের বাড়িতে দাদারা চিরকাল মাতৃভাষায় চর্চা করিয়া আসিয়াছিলেন। আমার পিতাকে তাঁহার কোনো নূতন আত্মীয় ইংরেজিতে পত্র লিখিয়াছিলেন, সে পত্র লেখকের নিকটে তখনই ফিরিয়া আসিয়াছিল।’

[3] রাজনৈতিক ঘটনাবলি: ‘জীবনস্মৃতি’-তে রবীন্দ্রনাথ তাঁর দাদা জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের উদ্যোগে এবং রাজনারায়ণ বসুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত স্বাদেশিকতার সভা, দাদা জ্যোতিরিন্দ্রনাথের উদ্যোগে ধুতি ও পায়জামার সমন্বয়ে ভারতের একটি সর্বজনীন পরিচ্ছদ প্রচলনের চেষ্টা, স্বদেশি দেশলাই কারখানা বা কাপড়ের কল প্রতিষ্ঠায় যুবকদের উদ্যোগ প্রভৃতির উল্লেখ করেছেন।

[4] হিন্দুমেলা: ‘জীবনস্মৃতি’-তে নবগোপাল মিত্রের ‘হিন্দুমেলা সম্পর্কে নানা তথ্য পাওয়া যায়। ‘হিন্দুমেলা’র স্বদেশপ্রেম সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন যে, “ভারতবর্ষকে স্বদেশ বলিয়া ভক্তির সহিত উপলব্ধির চেষ্টা সেই প্রথম হয়। মেজদাদা (সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর) সেই সময়ে বিখ্যাত জাতীয় সংগীত ‘মিলে সবে ভারতসন্তান’ রচন করেছিলেন।”

উপসংহার: কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘জীবনস্মৃতি’ মূলত তাঁর নিজের আত্মজীবনী হলেও এই গ্রন্থে তাঁর সমকালীন বাংলা তথা ভারতের রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসের বিভিন্ন তথ্য আলোচিত হয়েছে যেগুলি আধুনিক ভারতের ইতিহাসের মূল্যবান উপাদান।

৩। আধুনিক ভারতের ইতিহাসের উপাদান হিসেবে সরলা দেবী চৌধুরানির আত্মজীবনী ‘জীবনের ঝরাপাতা’-এর গুরুত্ব কী?

অথবা, ‘জীবনের ঝরাপাতা’ থেকে সমকালীন ইতিহাসের কোন্ দিকগুলি ফুটে উঠেছে?

ইতিহাসের উপাদান হিসেবে ‘জীবনের ঝরাপাতা’

ভূমিকা: সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাগনি সরলা দেবী চৌধুরানির লেখা ‘জীবনের ঝরাপাতা’ বাংলা সাহিত্যের একটি মূল্যবান ও সুখপাঠ্য আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা। এটি আধুনিক ভারতের ইতিহাস রচনায় বিভিন্নভাবে তথ্য সরবরাহ করে।

[1] বৈপ্লবিক কর্মকাণ্ড: সরলা দেবী চৌধুরানি ভারতের ব্রিটিশ-বিরোধী সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনকে সমর্থন করেছেন। তিনি সহিংস বিপ্লবের দ্বারা ভারতের স্বাধীনতা অর্জনেরও স্বপ্ন দেখতেন। ‘জীবনের ঝরাপাতা’র ছত্রে ছত্রে ভারতের সশস্ত্র বৈপ্লবিক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে নানা তথ্য ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। তিনি নিজেও যে এই ধরনের সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তা ‘জীবনের ঝরাপাতা’ থেকে জানা যায়।

[2] অর্থনৈতিক শোষণ: ব্রিটিশ শাসনকালে ভারতে অর্থনৈতিক শোষণের নানা ছবি ‘জীবনের ঝরাপাতা’ গ্রন্থে আলোচিত হয়েছে। নীলচাষি, চা বাগানের কুলি ও শ্রমিক, সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ কীভাবে ব্রিটিশ এবং তাদের সহযোগীদের অত্যাচার ও শোষণের শিকার হয়েছিল তা সরলা দেবী চৌধুরানি তাঁর গ্রন্থে স্পষ্টভাবে আলোচনা করেছেন।

[3] ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহল: ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহলের বিভিন্ন ঘটনা। যেমন-ঠাকুরবাড়ির সাংস্কৃতিক চর্চা, ঈশ্বরভাবনা, বিভিন্ন সামাজিক বিধান পালন, শিশুদের একসঙ্গে বাড়তে থাকা প্রভৃতি নানা ঘটনার খণ্ডচিত্র ‘জীবনের ঝরাপাতা’-য় উঠে এসেছে। এগুলি আধুনিক বাংলার সামাজিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য।

[4] স্বদেশি আন্দোলন: ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দের স্বদেশি আন্দোলন সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য ‘জীবনের ঝরাপাতা’য় পাওয়া যায়। স্বদেশি আন্দোলনের যুগে স্বদেশি পণ্যের উৎপাদন ও প্রচারের উদ্দেশ্যে তিনি ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান গঠন করেন।

[5] রবীন্দ্রনাথ ও স্বামী বিবেকানন্দ: সরলা দেবী চৌধুরানি সে যুগের দুই মনীষী রবীন্দ্রনাথ ও স্বামী বিবেকানন্দের মধ্যে যোগসূত্র ছিলেন। এই দুই মনীষীর প্রতি সরলা দেবীর কেমন দৃষ্টিভঙ্গি ও মূল্যায়ন ছিল তা বই থেকে জানা যায়।

উপসংহার: সরলা দেবী চৌধুরানির আত্মজীবনী ‘জীবনের ঝরাপাতা’ আধুনিক ভারত ইতিহাসের এক সংগ্রামী অধ্যায়কে তুলে ধরে। ব্রিটিশ শাসনকালে ভারতে নানান আলোড়ন জীবন্ত হয়ে উঠেছে তাঁর এই গ্রন্থে।

৪। আধুনিক ভারতের ইতিহাসের উপাদান হিসেবে সরকারি নথিপত্রের গুরুত্ব কী?

ইতিহাসের উপাদান হিসেবে সরকারি নথিপত্রের গুরুত্ব

ভূমিকা: আধুনিক ভারতের ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে বিভিন্ন সরকারি নথিপত্র, যেমন-সরকারি প্রতিবেদন, পুলিশ, গোয়েন্দা, সরকারি আধিকারিক প্রমুখের প্রতিবেদন, বিভিন্ন বিবরণ, চিঠিপত্র প্রভৃতি উপাদানের যথেষ্ট গুরুত্ব রয়েছে। যেমন-

[1] বৈপ্লবিক কর্মকাণ্ড: ব্রিটিশ সরকার যে বিভিন্ন বৈপ্লবিক কর্মকাণ্ডের প্রতি গোপনে নজরদারি চালাত, সে বিষয়ে সমকালীন পুলিশ ও গোয়েন্দাদের বিভিন্ন প্রতিবেদন ও বিভিন্ন সরকারি নথিপত্র থেকে বর্তমানে জানা সম্ভব হয়েছে।

[2] কমিশনের রিপোর্ট: সরকার কর্তৃক নিযুক্ত বিভিন্ন কমিশনের রিপোর্ট থেকে সমকালীন বিভিন্ন বিষয়ের গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক তথ্যাদি পাওয়া যায়। যেমন-নীল কমিশনের (১৮৬০ খ্রি.) রিপোর্ট থেকে বাংলা চাষিদের ওপর নীলকরদের অত্যাচার, হান্টার কমিশনের (১৮৮২ খ্রি.) রিপোর্ট থেকে সমকালীন শিক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কিত বিভিন্ন তথ্য জানা যায়।

[3] আন্দোলন দমনের নীতি: ব্রিটিশ সরকার কীভাবে ভারতীয়দের রাজনৈতিক আন্দোলনগুলি দুর্বল বা দমন করার চেষ্টা চালাত সে বিষয়ে বিভিন্ন সরকারি নথিপত্র, বিশেষ করে সরকারের বিভিন্ন আধিকারিকদের চিঠিপত্র থেকে জানা যায়। যেমন-সরকার গোপনে কংগ্রেসকে দুর্বল করার চেষ্টা চালিয়েছিল, বাঙালির রাজনৈতিক ঐক্য ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে কার্জন বঙ্গভঙ্গ করেছিলেন প্রভৃতি তথ্যাদি সরকারি চিঠিপত্র থেকে জানা যায়।

[4] ভারতীয়দের সংস্কার: সমকালীন ভারতীয়দের বিভিন্ন সংস্কারমূলক কার্যাবলির প্রতি সরকারের মনোভাব মোটেই ভালো ছিল না-তা জানার জন্য সরকারি নথিপত্র বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। যেমন-স্বামী বিবেকানন্দের ভাবাদর্শ পাশ্চাত্যকে মুগ্ধ করলেও তৎকালীন ব্রিটিশ-ভারতের সরকারি নথিপত্র থেকে জানা যায় যে, বিবেকানন্দের রামকৃয় মঠ ও মিশনকে সরকার সুনজরে দেখেনি।

[5] একমাত্র নির্ভরযোগ্যতা: কোনো কোনো ক্ষেত্রে সরকারি নথিপত্র ভারত-ইতিহাসের একমাত্র নির্ভরযোগ্য উপাদান হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। যেমন-বর্তমান তথ্যাদির সহায়তায় নেতাজি সুভাষচন্দ্রের অন্তর্ধান রহস্যের কিনারা করা সম্ভব না হওয়ায় অনেকে একমাত্র সরকারি নথিপত্র প্রকাশিত হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন।

উপসংহার: সরকারি নথিপত্র হল এমন একটি উপাদান, যা ইতিহাসের অনেক লুকোনো দিক খুঁজে বের করে এনে দিতে পারে। শাসকের কার্যকলাপ জানার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হল এই সরকারি নথিপত্র।

৫। আধুনিক ভারতের ইতিহাসের উপাদান হিসেবে ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকার গুরুত্ব কী?

অথবা, ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকা কীভাবে আধুনিক ভারতের ইতিহাস রচনায় সহায়তা করতে পারে?

আধুনিক ডারতের ইতিহাসের উপাদান হিসেবে ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকা

ভূমিকা: আধুনিক ভারতের ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে সমসাময়িক যেসব সংবাদপত্রের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে সেগুলির মধ্যে সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য হল অত্যন্ত জনপ্রিয় ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকা।

[1] পত্রিকার প্রকাশ: ‘বঙ্গদর্শন’ ছিল ব্রিটিশ শাসনকালে প্রকাশিত একটি বিখ্যাত মাসিক সাহিত্য পত্রিকা। সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় কর্তৃক ১৮৭২ খ্রিস্টাব্দে ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকাটি প্রথম প্রকাশিত হয়। পত্রিকাটি প্রকাশের প্রথম থেকেই বঙ্কিমচন্দ্র ছিলেন এর সম্পাদক, লেখক ও প্রধান পরিচালক।

[2] শিক্ষিত সমাজের মুখপত্র: ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকা আত্মপ্রকাশের পর থেকেই তৎকালীন শিক্ষিত বাঙালি সমাজের প্রধান মুখপত্র হয়ে ওঠে। এই পত্রিকাতেই বাঙালি জাতির আধুনিক চিন্তার প্রতিফলন ঘটত। বঙ্কিমচন্দ্র ছাড়াও গঙ্গাচরণ, রামদাস সেন, অক্ষয় সরকার, চন্দ্রনাথ বসু প্রমুখ প্রতিভাবান লেখক এই পত্রিকায় নিয়মিত লিখতেন।

[3] সমকালীন তথ্য: ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকায় সমাজ, সাহিত্য, বিজ্ঞান, রাজনীতি, দর্শন, ধর্মতত্ত্ব প্রভৃতি বিভিন্ন বিষয়ে প্রবন্ধ ও বিভিন্ন উপন্যাস প্রকাশিত হত। এসব রচনা থেকে সেসময় বাংলায় ইংরেজ সরকার ও জমিদারের শোষণ ও অত্যাচার, সামাজিক পরিস্থিতি, সাধারণ মানুষের অবস্থা, সাহিত্য, রাজনীতি, দর্শন, ধর্মতত্ত্ব প্রভৃতি সম্পর্কে বহু তথ্য পাওয়া যায়।

[4] প্রভাব: [i] ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকার দ্বারা সমকালীন ভারতীয় জাতীয়তাবাদ যথেষ্ট প্রভাবিত হয়। [ii] বঙ্কিমচন্দ্রের লেখা ‘বন্দেমাতরম’ সংগীতটি প্রথম ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকাতেই প্রকাশিত হয়। ‘বন্দেমাতরম’ পরবর্তীকালে ভারতীয় বিপ্লবী ও জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের মূল মন্ত্রে পরিণত হয়। [iii] ‘বঙ্গদর্শন’-এ প্রকাশিত ‘সাম্য’-সহ বিভিন্ন প্রবন্ধ বাঙালি সমাজে সমাজতান্ত্রিক ভাবধারার প্রসারে যথেষ্ট সহায়তা করে।

উপসংহার: বঙ্কিমচন্দ্র সম্পাদিত ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকাটি সমকালের ঘটনাবলিকে যেভাবে তুলে ধরত তা আধুনিক ভারতের ইতিহাস রচনার আবার উপাদান হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। ভারতের জাতীয়তাবাদী ভাবধারার উদ্‌দ্গাতা এই পত্রিকা সমাজে স্বদেশপ্রেমের মন্ত্র প্রচার করেছিল।

৬। সাম্প্রতিককালে খেলাধুলা ও খেলাধুলার ইতিহাসচর্চা কীভাবে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে?

সাম্প্রতিককালে খেলাধুলা ও খেলাধুলার ইতিহাসচর্চা

ভূমিকা: খেলাধুলার ইতিহাস খুবই প্রাচীন। মানুষের জীবনে খেলাধুলার গুরুত্ব বোঝাতে গিয়ে রোমান কবি জুভেনাল বলেছেন, “মানুষ দুটো জিনিসের জন্য আকুল হতে পারে-রুটি ও খেলাধুলা।”

[1] খেলাধুলার জনপ্রিয়তা: বিগত শতক থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে খেলাধুলা সমাজের সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। ঐতিহাসিক হবসবম উল্লেখ করেছেন যে, বিংশ শতকে ইউরোপীয় জীবনধারার অন্যতম প্রধান সামাজিক অভ্যাস হল খেলাধুলা।

[2] খেলাধুলার গুরুত্ব : কোনো সমাজের খেলাধুলা সেই সমাজের স্বরূপ প্রকাশ করে থাকে। কোনো সমাজের মেয়েদের খেলাধুলায় অংশগ্রহণ সেই সমাজের নারী স্বাধীনতার প্রমাণ দেয়। ১৯১১ খ্রিস্টাব্দে সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ খেলোয়াড়দের হারিয়ে বাংলার মোহনবাগান দল আই এফ এ শিল্ড জিতে যে আনন্দে মেতে ওঠে, তা ছিল প্রকৃতপক্ষে ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশদের বাংলা ভাগের জবাব।

[3] জাতীয় আবেগের প্রকাশ: খেলাধুলা বর্তমানে জাতীয় আবেগে পরিণত হয়েছে। খেলাধুলা জাতীয়তাবাদ, সাম্প্রদায়িকতা, সমাজবিবর্তন, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক প্রভৃতিকে যথেষ্ট প্রভাবিত করে চলেছে।

[4] পাশ্চাত্যে খেলার ইতিহাসের চর্চা: সাম্প্রতিককালে পাশ্চাত্যে খেলাধুলার ইতিহাসচর্চা শুরু হয়েছে। জে এ ম্যাসান, রিচার্ড হোল্ড প্রমুখ গবেষক এই বিষয়ে কাজ শুরু করেছেন। ১৯৮২ খ্রিস্টাব্দে গড়ে উঠেছে ‘ব্রিটিশ সোসাইটি অব স্পোর্টস হিস্ট্রি’।

[5] ভারতে খেলার ইতিহাসচর্চা: সাম্প্রতিককালে বাংলা তথা ভারতে খেলাধুলার ইতিহাসচর্চায় যাঁরা বিশেষ খ্যাতিলাভ করেছেন। তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন বোরিয়া মজুমদার, কৌশিক বন্দ্যোপাধ্যায়, রূপক সাহা, গৌতম ভট্টাচার্য প্রমুখ।

উপসংহার: খেলাধুলা শারীরিক সক্ষমতা প্রদান করার পাশাপাশি বিনোদনেরও একটি বড়ো উৎস। তাই বর্তমান মানুষের কাছে খেলাধুলার গুরুত্ব বৃদ্ধির পাশাপাশি খেলাধুলার ইতিহাসচর্চার প্রসার ঘটেছে।

৭। সাম্প্রতিককালে পরিবেশের ইতিহাসচর্চা সম্পর্কে আলোচনা করো।

পরিবেশের ইতিহাসচর্চা

ভূমিকা: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত পরিবেশ নিয়ে মানুষের ভাবনাচিন্তা ছিল যথেষ্ট কম। কিন্তু মানুষ যেভাবে পরিবেশের ধারাবাহিক ক্ষতি করে চলেছে তাতে মানবসভ্যতার অস্তিত্ব আজ সংকটের মুখে পড়েছে।

[1] পরিবেশের ধ্বংসসাধন: আধুনিককালে যুদ্ধে ‘বিভিন্ন ভয়ানক মারণাস্ত্রের ব্যবহার, কৃষি-সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিষাক্ত রাসায়নিকের ব্যবহার, গাছপালা কেটে আধুনিক নগর ও শিল্পসভ্যতার প্রসার প্রভৃতির ফলে আমাদের চারিদিকের পরিবেশ ভয়ংকরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

[2] দূষণ: জল, বায়ু, খাদ্য, শব্দ প্রভৃতি দূষণ বর্তমানে মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছে গেছে যে, দূষণের মাত্রা এই রকম হারে বাড়তে থাকলে অদূর ভবিষ্যতে প্রাকৃতিক পরিবেশে মানুষ তথা জীবকুলের অস্তিত্ব সম্পূর্ণ লুপ্ত হতে পারে।

[3] আন্দোলন: পরিবেশের ধ্বংসসাধন ও দূষণের সম্পর্কে মানুষ ক্রমাগত সচেতন হয়ে উঠেছে। শুরু হয়েছে পরিবেশবাদী নানা আন্দোলন। ভারতে চিপকো আন্দোলন, নর্মদা বাঁচাও আন্দোলন, তেহরি-গাড়োয়াল আন্দোলন প্রভৃতি পরিবেশবাদী আন্দোলন যথেষ্ট জনপ্রিয়তা লাভ করেছে।

[4] ইউরোপে পরিবেশের ইতিহাসচর্চা: সাম্প্রতিককালে ইউরোপে পরিবেশের ইতিহাসচর্চার যথেষ্ট প্রসার ঘটেছে। এই বিষয়ে ইউরোপের কয়েকটি উল্লেখযোগ্য গবেষণাকর্ম হল র‍্যাচেল কারসন রচিত ‘সাইলেন্ট স্প্রিং’, আলফ্রেড ক্রসবি রচিত ‘ইকোলজিক্যাল ইম্পিরিয়ালিজম’, রিচার্ড গ্রোভ রচিত ‘গ্রিন ইম্পিরিয়ালিজম’ প্রভৃতি।

[5] ভারতে ও বাংলায় পরিবেশের ইতিহাসচর্চা: পরিবেশের ইতিহাস নিয়ে সাম্প্রতিককালে ভারতে এবং বাংলায়ও যথেষ্ট চর্চা হচ্ছে। ইরফান হাবিব, ড. মণীষ প্রধান, সুধাংশু পাত্র, অশোক কুমার বসু, তরুণ সরকার, অপরেশ বন্দ্যোপাধ্যায়, শমিত কর, সাহিদা বেগ এই বিষয়ে গবেষণা করেছেন।

উপসংহার: মানবসভ্যতার সমস্ত কর্মকান্ডের সঙ্গে পরিবেশ অঙ্গাঙ্গী-ভাবে জড়িত। তাই পরিবেশ ইতিহাসচর্চার বিকাশ ও অগ্রগতি বর্তমানে বেশ প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।

আরো পড়ুন : কলিঙ্গদেশে ঝড়-বৃষ্টি কবিতার প্রশ্ন উত্তর

আরও পড়ুন প্রয়োজনে
বিপ্লবী আদর্শ নেপোলিয়নীয় সাম্রাজ্য ও জাতীয়তাবাদ প্রশ্ন উত্তর ক্লাস নাইন ইতিহাস | Class 9 History 2nd Chapter Question Answer Click here
নবম শ্রেণি ইতিহাস সাজেশন ২০২৬ | Class 9 History Suggestion 2026 Click here
Madhyamik History Suggestion 2025-2026 Click here
ফরাসি বিপ্লবের কয়েকটি দিক (প্রথম অধ্যায় নবম শ্রেণি) প্রশ্ন উত্তর | Cass 9 History First Chapter Long Question Answer (Exclusive Answer) Click here

Leave a Comment