ফরাসি বিপ্লবের কয়েকটি দিক (প্রথম অধ্যায় নবম শ্রেণি) প্রশ্ন উত্তর | Cass 9 History First Chapter Long Question Answer (Exclusive Answer)

বোর্ড : বিষয়বস্তু

ফরাসি বিপ্লবের কয়েকটি দিক (প্রথম অধ্যায় নবম শ্রেণি) প্রশ্ন উত্তর | Cass 9 History First Chapter Long Question Answer

ফরাসি বিপ্লবের কয়েকটি দিক
ফরাসি বিপ্লবের কয়েকটি দিক

১। ফরাসি বিপ্লবের অর্থনৈতিক কারণগুলি আলোচনা করো।
অথবা, ফ্রান্সকে ‘ভ্রান্ত অর্থনীতির এক বিশাল জাদুঘর বলা হয় কেন আলোচনা করো।

ফরাসি বিপ্লব (১৭৮৯ খ্রি.) আধুনিক বিশ্বের ইতিহাসে একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। ঐতিহাসিক কোবান ফরাসি বিপ্লবকে অসংখ্য ছোটো-বড়ো খরস্রোতা নদীর সমন্বয়ে ছড়িয়ে-পড়া ভয়ানক বন্যার সঙ্গে তুলনা করেছেন।

ফরাসি বিপ্লবের অর্থনৈতিক কারণ

বিভিন্ন অর্থনৈতিক কারণ ফরাসি বিপ্লবের জন্য বিশেষভাবে দায়ী ছিল। যেমন-

[1] সরকারি অপব্যয়: ফরাসি রাজপরিবার অকাতরে অর্থব্যয় করে রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক শক্তিকে দুর্বল করে দেন। চতুর্দশ লুই (১৬৪৩-১৭১৫ খ্রি.), পঞ্চদশ লুই (১৭১৫-৭৪ খ্রি.) ও ষোড়শ লুই-এর (১৭৭৪-৯৩ খ্রি.) আমলে সম্রাট-সহ রাজপরিবারের অমিতব্যয়িতা ও বিলাসিতা চরমে পৌঁছোয়। ফলে ফরাসি রাজকোশ শূন্য হয়ে যায়।

[2] ব্যয়বহুল যুদ্ধ: চতুর্দশ ও পঞ্চদশ লুই বিভিন্ন ব্যয়বহুল যুদ্ধে অংশ নিয়ে বিপুল অর্থব্যয় করেন। ষোড়শ লুই আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধে যোগ দিয়ে বিপুল অর্থ ব্যয় করেন। ফলে দেশে অর্থনৈতিক সংকট দেখা দেয়।

[3] অধিকারভোগীদের আয়: ফ্রান্সের প্রায় অর্ধেক কৃষিজমিই ছিল যাজক ও অভিজাত সম্প্রদায়ের হাতে। জমি থেকে বিপুল আয় সত্ত্বেও তারা সরকারকে টাইলে বা ভূমিকর, ক্যাপিটেশন বা উৎপাদন কর, ভিটিংয়েমে বা আয়কর প্রভৃতি কর দিত না। তা সত্ত্বেও তারা রাষ্ট্রে বিভিন্ন ধরনের সুযোগসুবিধা ভোগ করত।

[4] তৃতীয় শ্রেণির করের বোঝা: রাষ্ট্র, গির্জা ও জমিদাররা তৃতীয় শ্রেণির কাছ থেকে বিভিন্ন ধরনের কর আদায় করত। টাইলে, ক্যাপিটেশন, ভিটিংয়েমে প্রভৃতি প্রত্যক্ষ কর ছাড়াও তারা সরকারকে গ্যাবেলা বা লবণ কর, ভোগ্য পণ্যের ওপর কর, যাজকদের টাইদ বা ধর্মকর, এইডস বা মদ, তামাক প্রভৃতির ওপর কর, করভি বা প্রভুর জমিতে বেগার শ্রমদান, সামন্তপ্রভুদের পথঘাট ব্যবহার, শস্য ভাঙানো ও জমি হস্তান্তরের জন্য কর, অন্যান্য অতিরিক্ত কর প্রভৃতি দিতে বাধ্য হত। এত রকম কর মিটিয়ে কৃষকের হাতে উৎপন্ন ফসলের মাত্র ২০ শতাংশ অবশিষ্ট থাকত।

[5] মধ্যবিত্তদের দুরবস্থা: অর্থনীতিবিদ অ্যাডাম স্মিথ মনে করেন যে, বিপ্লবের আগে ফ্রান্স ছিল “ভ্রান্ত অর্থনীতির জাদুঘর”। ত্রুটিপূর্ণ অর্থনীতির জন্য দেশে দ্রব্যমূল্য ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেলে দরিদ্র মানুষ সীমাহীন দুর্দশার মুখে পড়ে। খাদ্য ও অন্যান্য দ্রব্যের মূল্য গরিব মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যায়। অন্যদিকে ধনী বুর্জোয়া, ব্যবসায়ী, শিল্পপতিরা স্বাধীন ও অবাধ বাণিজ্যের জন্য শুল্ক ও নিয়ন্ত্রণ লোপের দাবি জানায়।

মূল্যায়ন: ঐতিহাসিক মার্সেল রাইনার বলেছেন যে, “ফরাসি বিপ্লবের সামাজিক ও অর্থনৈতিক পটভূমি বাদ দিয়ে এই বিপ্লবের প্রকৃত কারণ বোঝা যায় না।” ঐতিহাসিক মর্স স্টিফেন্স বিপ্লবের জন্য অর্থনৈতিক কারণের ওপর বেশি গুরুত্ব দিয়ে বলেছেন যে, “এই বিপ্লবের প্রধান কারণ ছিল অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক-দার্শনিক ও সামাজিক নয়।”

২। ফরাসি বিপ্লবের রাজনৈতিক কারণগুলি আলোচনা করো।
অথবা, ফরাসি বিপ্লব সৃষ্টিতে রাজতন্ত্র কতটা দায়ী ছিল?
অথবা, ফরাসি বিপ্লবের পিছনে বুরবোঁ রাজাদের দায়িত্ব কতটা ছিল?

অষ্টাদশ শতকে ফ্রান্সে বুরবোঁ বংশের নেতৃত্বে কেন্দ্রীভূত স্বৈরাচারী রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত ছিল। ঐশ্বরিক ক্ষমতায় বিশ্বাসী এই রাজতন্ত্রে রাজা ছিলেন দেশের সর্বোচ্চ শাসক, আইন প্রণয়নকারী এবং প্রধান বিচারক। শাসনব্যবস্থায় জনগণের মতামতের কোনো মূল্য ছিল না।

ফরাসি বিপ্লবের রাজনৈতিক কারণ:

১৭৮৯ খ্রিস্টাব্দে ফরাসি বিপ্লব সৃষ্টিতে রাজতন্ত্রের বিভিন্ন ত্রুটিবিচ্যুতি ও রাজতন্ত্রের দায়িত্ব বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

[1] রাজাদের দুর্বলতা: ফরাসি রাজা চতুর্দশ লুই (১৬৪৩-১৭১৫ খ্রি) ছিলেন চরম স্বৈরাচারী। তিনি বলতেন “আমিই রাষ্ট্র”। অলস ও বিলাসী রাজা পঞ্চদশ লুই (১৭১৫-৭৪ খ্রি.) তাঁর উপপত্নী মাদাম দা পম্পাদুর-এর দ্বারা প্রভাবিত হয়ে শাসন পরিচালনা করলে প্রশাসন দুর্নীতি ও স্বজনপোষণে ছেয়ে যায়। এরপর অযোগ্য রাজা ষোড়শ লুই (১৭৭৪-৯৩ খ্রি.) রাজতন্ত্রকে অবক্ষয়ের শেষ সীমায় নিয়ে যান।

[2] অভিজাতদের আধিপত্য: প্রশাসনে অভিজাত সম্প্রদায়ের। আধিপত্য শাসনব্যবস্থায় চরম বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করে। প্রশাসন প্রচন্ড দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে। ‘ইনটেনডেন্ট’ নামে দুর্নীতিপরায়ণ কর্মচারীরা খুবই ক্ষমতাশালী হয়ে ওঠে। অভিজাত রাজপুরুষরা ‘লেতর দ্য ক্যাশে’ নামে এক রাজকীয় পরোয়ানার দ্বারা যে-কোনো ব্যক্তিকে গ্রেফতার করে বিনা বিচারে কারারুদ্ধ করে রাখার অধিকার পায়।

[3] ত্রুটিপূর্ণ আইন: অষ্টাদশ শতকে ফরাসি আইন ছিল অত্যন্ত ত্রুটিপূর্ণ, জটিল ও দুর্বোধ্য। দেশের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন ধরনের আইন ও দণ্ডবিধি প্রচলিত ছিল। আইনগুলি ছিল অত্যন্ত নির্মম। সাধারণ অপরাধের জন্যও অনেকসময় মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হত।

[4] বিচারব্যবস্থায় ত্রুটি: ফরাসি বিচারব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত জটিল, ব্যয়বহুল ও দুর্নীতিগ্রস্ত। অধিকাংশ বিচারক ছিলেন অসৎ ও দুর্নীতিপরায়ণ। অপরাধীদের কাছ থেকে ঘুষ গ্রহণ, জরিমানা আদায় প্রভৃতির দ্বারা দুর্নীতিপরায়ণ বিচারকরা বিপুল অর্থ উপার্জন করতেন।

[5] অমিতব্যয়িতা: ফরাসি রাজপরিবার ছিল সীমাহীন অমিতব্যয়ী। রাজপরিবারের সেবাকার্যের উদ্দেশ্যে ভার্সাই রাজপ্রাসাদে ১৮ হাজার কর্মচারী নিযুক্ত ছিল। রানি মারি আঁতোয়ানেতের ব্যক্তিগত কর্মচারীর সংখ্যাই ছিল ৫০০ জন। রাজপরিবারের অমিতব্যয়িতা দেশের অর্থসংকট তীব্রতর করলে দেশবাসীর মনে এর বিরূপ প্রভাব পড়ে।

[6] ত্রুটিপূর্ণ রাজস্বব্যবস্থা: ফ্রান্সের ৯৫ শতাংশ সম্পদ যাজক ও অভিজাত সম্প্রদায়ের হাতে থাকলেও এর জন্য তাদের কাছ থেকে কোনো কর আদায় করা হত না। ফলে যাবতীয় করের বোঝা বহন করতে হত দেশের মাত্র ৫ শতাংশ সম্পদের মালিক তৃতীয় সম্প্রদায়কে। রাজকীয় কর ছাড়াও সামন্তপ্রভু ও গির্জা তৃতীয় সম্প্রদায়ের কাছ থেকে বিভিন্ন ধরনের কর আদায় করত।

[7] ষোড়শ লুই-এর ভূমিকা: দেশের অর্থনৈতিক সংকট অত্যন্ত তীব্র হয়ে উঠলে রাজা ষোড়শ লুই-এর উচিত ছিল যাজক ও অভিজাতদের বিশেষ অধিকার খর্ব করে এবং তাদের ওপর করের বোঝা চাপিয়ে পরিস্থিতির সামাল দেওয়া। কিন্তু ষোড়শ লুই একাজে জোরালো পদক্ষেপ না নেওয়ায় জনগণ অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হয়।

মূল্যায়ন: ফরাসি বিপ্লবের জন্য রাজতন্ত্রের দায়িত্বকে কোনোভাবে অস্বীকার করা যায় না। ঐতিহাসিক ফিশার বিপ্লবের জন্য ফরাসি রাজতন্ত্রকে দায়ী করেছেন। ঐতিহাসিক মাদেলাঁ-ও বলেছেন যে, “ফরাসি রাজতন্ত্রই বিপ্লব সৃষ্টি করেছে।”

৩। ফরাসি বিপ্লবের আগে ফ্রান্সের সমাজকাঠামো কেমন ছিল?

বিপ্লবের আগে ফরাসি সমাজ ছিল মধ্যযুগীয় ও সামন্ততান্ত্রিক। ফ্রান্সের এই সমাজব্যবস্থাকে দার্শনিক ভলতেয়ার ‘রাজনৈতিক কারাগার’ বলে অভিহিতে করেছেন। সমাজে বৈষম্য প্রবলভাবে বিদ্যমান ছিল।

বিপ্লবের আগে ফ্রান্সের সামাজিক শ্রেণি ও বৈষম্য এই সময় ফরাসি সমাজ মূলত তিনটি সম্প্রদায় বা শ্রেণিতে বিভক্ত ছিল। যথা-[1] যাজক সম্প্রদায় বা প্রথম শ্রেণি, [2] অভিজাত সম্প্রদায় বা দ্বিতীয় শ্রেণি এবং [3] বুর্জোয়া ও কৃষক সম্প্রদায় বা তৃতীয় শ্রেণি। এই তিনটি শ্রেণির মধ্যে যাজক ও অভিজাত সম্প্রদায় ছিল ‘বিশেষ অধিকারপ্রাপ্ত’ শ্রেণি এবং তৃতীয় শ্রেণি ছিল অধিকারহীন শ্রেণি।

[1] যাজক সম্প্রদায় বা প্রথম শ্রেণি: ফরাসি সমাজব্যবস্থায় প্রথম শ্রেণি ছিল যাজক সম্প্রদায়।

  • [i] সংখ্যা: বিপ্লবের সময় ফ্রান্সে যাজকদের সংখ্যা ছিল ১ লক্ষ ২০ হাজার অর্থাৎ, ফ্রান্সের মোট জনসংখ্যার ০.৫ শতাংশ।
  • [ii] জমি থেকে আয়: যাজকদের সংখ্যা অতি সামান্য হলেও ফ্রান্সের সমগ্র কৃষিজমির ১/৫ অংশই ছিল যাজকদের গির্জার অধীনে। এই জমির জন্য যাজকরা কোনো নিয়মিত কর দিত না। ‘কনট্রাক্ট অব পোইসি’ নামে এক চুক্তি অনুসারে তারা রাজাকে স্বেচ্ছাকর দিত। গির্জার বিপুল আয় যাজকরা ভোগ করত।
  • [iii] অন্যান্য আয়: এ ছাড়াও যাজকরা জনগণের কাছ থেকে টাইদ বা ধর্মকর, মৃত্যুকর, বিবাহকর প্রভৃতি আদায় করত।

[2] অভিজাত সম্প্রদায় বা দ্বিতীয় শ্রেণি: অভিজাত সম্প্রদায় ছিল ফ্রান্সের দ্বিতীয় শ্রেণি।

  • [i] সংখ্যা: বিপ্লবের সময় ফ্রান্সে অভিজাতদের মোট সংখ্যা ছিল ৩ লক্ষ ৫০ হাজার, অর্থাৎ দেশের মোট জনসংখ্যার মাত্র ১.৫ শতাংশ।
  • [ii] জমি: অভিজাতরা সংখ্যায় সামান্য হলেও ফ্রান্সের কৃষিজমির ১/২ অংশ ছিল অভিজাতদের হাতে। এই জমির জন্য তারা সরকারকে কোনো ভূমিকর দিত না।
  • [iii] সুযোগসুবিধা: অভিজাতরা তাদের বংশমর্যাদার জোরে বিভিন্ন ধরনের সুযোগসুবিধা ভোগ করত এবং বিভিন্ন ধরনের সামন্তকর আদায় করত। প্রশাসনিক ও বিচারবিভাগের উচ্চপদগুলি মূলত তাদের অধিকারে থাকায় তারাই শাসন পরিচালনা করত।

[3] বুর্জোয়া ও কৃষক সম্প্রদায় বা তৃতীয় শ্রেণি: ফরাসি সমাজব্যবস্থায় একদিকে বুর্জোয়া বা মধ্যবিত্ত, ব্যবসায়ী, বুদ্ধিজীবী প্রমুখ সম্পদশালী গোষ্ঠী এবং অন্যদিকে দুঃস্থ কৃষক, দিনমজুর প্রমুখ দরিদ্র জনগোষ্ঠী তৃতীয় শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত ছিল।

  • [i] ধনী শ্রেণি: ধনী বুর্জোয়ারা ব্যাবসাবাণিজ্যের মাধ্যমে প্রচুর অর্থসম্পদের মালিক হলেও তারা কখনোই অভিজাতদের সমান সামাজিক মর্যাদা ও অধিকার পেত না।
  • [ii] দরিদ্র শ্রেণি: তৃতীয় শ্রেণির একটি বড়ো অংশের মানুষ ছিল দরিদ্র কৃষক, কারিগর, দোকানদার, দিনমজুর প্রমুখ। অনাহার, অর্ধাহার, অত্যাচার ও শোষণে অতিষ্ট এই দরিদ্ররা ফ্রান্সের প্রচলিত সমাজব্যবস্থার ওপর ক্ষুব্ধ ছিল।

মূল্যায়ন: ফ্রান্সের সামাজিক বৈষম্য ফরাসি বিপ্লবের অন্যতম কারণ ছিল। ঐতিহাসিক লেফেভর, মাতিয়ে, জোরেস প্রমুখ ফরাসি বিপ্লবের সামাজিক কারণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। ঐতিহাসিক রাইকার বলেছেন যে, ফরাসি বিপ্লব ছিল “সামাজিক সাম্য অর্জনের উদ্দেশ্যে বুর্জোয়াদের আন্দোলন।”

৪। ফরাসি বিপ্লবের পেছনে দার্শনিকদের অবদান লেখো।

ঐতিহাসিক টেইন, রুস্তান, সেতোব্রিয়াঁ, মাদেলা, জোরেস, মাতিয়ে প্রমুখ মনে করেন যে, ১৭৮৯ খ্রিস্টাব্দে সংঘটিত ফরাসি বিপ্লবের পশ্চাতে দার্শনিকদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। ফরাসি দার্শনিকগণ তাঁদের লেখনীর দ্বারা রাষ্ট্রব্যবস্থার ত্রুটিপূর্ণ দিকগুলি দেশের সাধারণ মানুষের সামনে তুলে ধরেন। ফলে ফ্রান্সের শোষিত ও অবহেলিত মানুষের মনে বিপ্লবের বীজ রোপিত হয়।

ফরাসি বিপ্লবে দার্শনিকদের ভূমিকা/অবদান

ফ্রান্সের জনগণের মনে বিপ্লবের বীজ রোপণে মন্তেস্কু, ভলতেয়ার, রুশো, ডেনিস দিদেরা, ডি’ এলেমবার্ট প্রমুখ দার্শনিক এবং ফিজিওব্র্যাট নামে দার্শনিক গোষ্ঠীর উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল।

[1] মন্তেস্কু: ফরাসি দার্শনিক মন্তেস্কু (১৬৮৯-১৭৫৫ খ্রি.) ছিলেন দেশের বঞ্চিত শ্রেণির প্রাণপুরুষ। মন্তেস্কু তাঁর ‘দ্য স্পিরিট অব লজ’ বা ‘আইনের মর্ম’ নামক গ্রন্থে সম্রাটের স্বৈরাচারী শাসন ও স্বর্গীয় অধিকারতত্ত্বের তীব্র সমালোচনা করেন। ‘দ্য পার্সিয়ান লেটার্স’ বা ‘পার্সিয়ার পত্রাবলি’নামে অপর একটি গ্রন্থে নিয়মতান্ত্রিক রাজতন্ত্রের সমর্থক মন্তেস্কু ফ্রান্সের পুরাতনতন্ত্র, অভিজাততন্ত্র ও স্বৈরাচারী রাজতন্ত্রের কঠোর সমালোচনা করেন। ক্ষমতা স্বতন্ত্রীকরণ নীতির সমর্থক মন্তেস্ক মানুষের ব্যক্তিস্বাধীনতা রক্ষার উদ্দেশ্যে দেশের আইনবিভাগ, শাসনবিভাগ ও বিচারবিভাগকে পৃথক করার দাবি জানান।

[2] ভলতেয়ার: ভলতেয়ার (১৬৯৪-১৭৭৮ খ্রি.) ছিলেন ফ্রান্সের অন্যতম দার্শনিক, সাহিত্যিক ও চিন্তাবিদ। তিনি ফ্রান্সের স্বৈরাচারী রাজতন্ত্রের তীব্র নিন্দা করেন। তিনি তীক্ষ্ণ ব্যাঙ্গাত্মক রচনার মাধ্যমে ফরাসি গির্জার দুর্নীতি ও কুসংস্কার, অন্ধবিশ্বাস অত্যাচারকে আক্রমণ করেন। ও তিনি ক্যাথোলিক গির্জাকে ‘বিশেষ অধিকারপ্রাপ্ত উৎপাত’ বলে অভিহিত করেন। তাঁর দুটি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ হল ‘কাঁদিদ’ (Candide) ও ‘দার্শনিকের অভিধান’ (Philosophical Dictio-nary)।

[3] রুশো: অষ্টাদশ শতকে ফ্রান্সের সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য ও জনপ্রিয় দার্শনিক ছিলেন জাঁ জ্যাক রুশো (১৭১২-১৭৭৮ খ্রি.)। তিনি তাঁর সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ ‘সামাজিক চুক্তি’ (Social Contract)-তে রাজার ঐশ্বরিক ক্ষমতা যুক্তি সহকারে খণ্ডন করেন। তিনি বলেন যে, রাষ্ট্রের সার্বভৌম শক্তির উৎস হল জনগণ। কেননা, ‘জনগণের ইচ্ছা’ (‘General Will’) অনুসারেই একদিন চুক্তির দ্বারা রাজা শাসনক্ষমতা লাভ করেছিলেন। তাই রাজাকে যে-কোনো সময় ক্ষমতাচ্যুত করার অধিকার জনগণের আছে। তিনি তাঁর ‘অসাম্যের সূত্রপাত’ (Origin of Inequality) গ্রন্থে বলেন যে, মানুষ স্বাধীন হয়ে এবং সমান অধিকার নিয়ে জন্মায়। কিন্তু বৈষম্যমূলক সমাজব্যবস্থা তাকে দরিদ্র ও পরাধীন করে।

[4] ডেনিস দিদেরো ও ডি’ এলেমবার্ট: ডেনিস দিদেরো, ডি’ এলেমবার্ট প্রমুখ দার্শনিক রাষ্ট্র ও গির্জার অন্যায়ের কঠোর সমালোচনা করেন। তারা অসীম পরিশ্রম করে সতেরো খণ্ডে ‘বিশ্বকোশ’ রচনা করেন। এতে বিভিন্ন দার্শনিকের রচনা, রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, ঐতিহাসিক প্রভৃতি বিষয় স্থান পায়।

[5] ফিজিওক্র্যাট গোষ্ঠী: অষ্টাদশ শতকে ফ্রান্সে ফিজিওক্র্যাট নামে একটি অর্থনীতিবিদ গোষ্ঠী ফ্রান্সের বাণিজ্যে শুল্কনীতি ও নিয়ন্ত্রণ প্রথার তীব্র সামলোচনা করে এবং অবাধ বাণিজ্যনীতি ও বেসরকারি শিল্প স্থাপনের দাবি জানায়। এই মতবাদের অন্যতম সমর্থক ছিলেন কেনে।

মূল্যায়ন: ফ্রান্সে বিপ্লব সংঘটিত হওয়ার ক্ষেত্রে উপরোক্ত দার্শনিকদের অতি নগণ্য অবদান ছিল বলে কোনো কোনো ঐতিহাসিক মনে করেন। অবশ্য ঐতিহাসিক রাইকার, সেতোব্রিয়াঁ, টেইন, রুস্তান প্রমুখ ফরাসি বিপ্লবের জন্য দার্শনিকদের ভূমিকা স্বীকার করেছেন। টেইন বলেছেন যে, “ফ্রান্স দর্শনের বিষ পান করেছিল।”

৫। অভিজাত বিদ্রোহ সম্পর্কে কী জান? অথবা, টীকা লেখো: অভিজাত বিদ্রোহ।

ফরাসি রাজা ষোড়শ লুই-এর অর্থমন্ত্রী ব্রিয়াঁ অন্যান্য সম্প্রদায়ের সঙ্গে অভিজাতদের ওপরও করারোপের প্রস্তাব দিলে অভিজাত সম্প্রদায় ক্ষুদ্ধ হয়ে ওঠে। রাজার সঙ্গে অভিজাতদের সম্পর্কের অবনতি ঘটে।

[1] স্টেট্স জেনারেলের অধিকার: অভিজাতরা ব্রিয়াঁর কয়েকটি প্রস্তাব মেনে নিলেও স্ট্যাম্পকর ও ভূমিকরের প্রস্তাব বাতিল করে দেয়। তারা দাবি করে যে, একমাত্র স্টেটস জেনারেলের কর আরোপের অধিকার আছে।

[2] সদস্যকে নির্বাসন: ষোড়শ লুই পার্লামেন্টের কয়েকজন সদস্যের আচরণে উত্ত্যক্ত হয়ে নিজের ভাই ডিউক অব অর্লিয়েন্স-সহ তিনজন সদস্যকে নির্বাসিত করেন। এতে পার্লামেন্ট ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে এবং রাজার বিরুদ্ধে কয়েকটি আইন পাস করে ইচ্ছামতো নাগরিকদের গ্রেফতার, বিচারকদের অপসারণ প্রভৃতি বিষয়ে রাজার ক্ষমতা কেড়ে নেয়।

[3] পার্লামেন্ট মুলতুবি: পার্লামেন্টের আইনে ক্ষুদ্ধ হয়ে রাজা সমস্ত প্রদেশের পার্লামেন্টগুলি মুলতুবি করেন এবং ৫৭টি নতুন বিচারালয় স্থাপন করে নিজের প্রস্তাবিত সংস্কারগুলিকে আইনে পরিণত করেন।

[4] বিদ্রোহের সূচনা: রাজা পার্লামেন্ট মুলতুবি করলে তাঁর বিরুদ্ধে অভিজাতরা বিদ্রোহ শুরু করে দেয়। তুলোঁ, দ্যাফিনে, দুজোঁ প্রভৃতি স্থানে ব্যাপক বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে।

[5] গুরুত্ব: অভিজাতরা রাজার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ শুরু করে নিজের অজ্ঞাতে ফ্রান্সের স্বৈরাচারী দৈব রাজতন্ত্র ও পুরাতনতন্ত্রের মূলেই কুঠারাঘাত করে।

৬। টীকা লেখো: টেনিস কোর্টের শপথ

১৭৮৯ খ্রিস্টাব্দে নব নির্বাচিত জাতীয় সভার প্রথম অধিবেশনে তৃতীয় সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরা সকল সদস্যের একই কক্ষে বসা এবং মাথাপিছু ভোটের দাবিতে সরব হয়।

টেনিস কোর্টের শপথ

[1] বুর্জোয়াদের ক্ষোভ: তৃতীয় শ্রেণির প্রতিনিধিদের দাবি রাজা নাকচ করলে ক্ষুব্ধ প্রতিনিধিরা ১৭ জুন এক সভায় নিজেদের সভাকে ‘প্রকৃত জাতীয় সভা’ বলে ঘোষণা করে এবং দাবি করে, করধার্য করার অধিকার শুধু তাদেরই আছে।

[2] শপথ গ্রহণ: তৃতীয় সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরা ২০ জুন তাদের সভাকক্ষে গিয়ে দেখেন যে, সভাকক্ষটি তালাবন্ধ রয়েছে। এতে ক্ষুদ্ধ হয়ে তারা মিরাবোর ও আবে সিয়েস-এর নেতৃত্বে নিকটবর্তী টেনিস খেলার মাঠে জড়ো হয়। সেখানে তারা শপথ গ্রহণ করে যে, তারা যতদিন না ফ্রান্সের জন্য একটি নতুন সংবিধান রচনা করতে পারবে, ততদিন তারা ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করে যাবে। এই ঘটনা ‘টেনিস কোর্টের শপথ’ নামে পরিচিত।

[3] রাজার ভূমিকা: টেনিস কোর্টের শপথের ৩ দিন পর তিন সম্প্রদায়ের ঐক্যবদ্ধ অধিবেশনে রাজা প্রথম দুই শ্রেণির পক্ষ অবলম্বন করে তৃতীয় সম্প্রদায়ের সমস্ত দাবি অবৈধ বলে ঘোষণা করেন। এরপর রাজা সভাকক্ষ ত্যাগ করলেও তৃতীয় সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরা সেনা অভিযানের হুমকি উপেক্ষা করে সেখানে অবস্থান করতে থাকেন।

[4] পরিণতি: শেষপর্যন্ত চাপে পড়ে রাজা তৃতীয় সম্প্রদায়ের দাবি মেনে নেন। এভাবে বুর্জোয়া বিপ্লবের প্রথম পর্ব সাফল্যের সঙ্গে শেষ হয়।

উপসংহার: টেনিস কোর্টের শপথ ছিল রাজার বিরুদ্ধে সরাসরি বিদ্রোহের সূচনা। শেষ পর্যন্ত ২৭ জুন ভীত হাতাশাগ্রস্ত রাজা তিন সম্প্রদায়ের একত্রে অধিবেশনে বসার এবং মাথাপিছু ভোটের দাবি মেনে নেন।

৭। বাস্তিল দুর্গের পতনের গুরুত্ব লেখো।
অথবা, বাস্তিল দুর্গের পতনের তাৎপর্য কী ছিল?

ফরাসি রাজা ষোড়শ লুই বুর্জোয়াদের চাপের কাছে নতি স্বীকার করলেও তিনি পুরাতনতন্ত্রকে ফিরিয়ে আনার উদ্দেশ্যে জনপ্রিয় অর্থমন্ত্রী নেকারকে পদচ্যুত এবং প্যারিস ও ভার্সাইয়ে সেনা মোতায়েন করেন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে প্যারিসের জনতা ১৭৮৯ খ্রিস্টাব্দের ১৪ জুলাই বাস্তিল দুর্গ আক্রমণ ও দখল করে নেয়।

বাস্তিল দুর্গের পতনের গুরুত্ব :

বাস্তিল দুর্গের পতনের গুরুত্বগুলি হল-

[1] রাজার নতিস্বীকার : বাস্তিলের পতনের পর আতঙ্কিত রাজা প্যারিসে এসে বিপ্লবের তেরঙা (লাল-নীল-সাদা) পতাকাকে ফ্রান্সের প্রতীক বলে মেনে নেন। বিপ্লবী বেইলি-কে প্যারিস পৌরসভার মেয়র পদে বসানো হয়। জাতীয় রক্ষীবাহিনীকে সংগঠিত করে বিপ্লবী লাফায়েৎ-কে এর প্রধান সেনাপতি করা হয়।

[2 ] স্বৈরাচারী রাজতন্ত্রে আঘাত: কুখ্যাত বাস্তিল দুর্গ ছিল স্বৈরাচারী রাজতন্ত্র ও মধ্যযুগীয় স্বৈরতন্ত্র ও সামন্ততন্ত্রের প্রতীক। এখানে বিনা বিচারে প্রজাদের বন্দি করে রাখা হত। তাই বাস্তিলের পতনে রাজতন্ত্র ও সামন্ততন্ত্রের ওপর প্রত্যক্ষ আঘাত আসে। এর ফলে রাজতন্ত্রের প্রতিরোধ ক্ষমতা ভঙ্গুর হয়ে পড়ে।

[3] জনগণের শক্তিবৃদ্ধি: বাস্তিলের পতন ফ্রান্সের সাধারণ মানুষের শক্তি বহুগুণ বৃদ্ধি করে। প্রবল প্রতাপশালী রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সাধারণ মানুষের পক্ষে যে জয় লাভ করা সম্ভব তা বাস্তিলের পতনের ঘটনা প্রমাণ করে দেয়।

[4] অভিজাতদের দেশত্যাগ: বাস্তিলের ঘটনার পর আতঙ্কিত বহু অভিজাত প্রাণভয়ে বিদেশে চলে যায়। অভিজাতরা উপলব্ধি করে যে, বিদেশি শক্তির সাহায্য ছাড়া তাদের বিশেষ অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়।

উপসংহার: বাস্তিলের পতনের পর প্যারিসের শাসনক্ষমতা বুর্জোয়ারা দখল করে নেয়। ঐতিহাসিক গুডউইন বলেছেন যে, “বাস্তিলের পতনের মতো বহুমুখী ও সুদূরপ্রসারী ঘটনা বিপ্লবে আর ঘটেনি।”

৮। ফরাসি বিপ্লবে নারীদের অংশগ্রহণ সম্পর্কে লেখো।
অথবা, ১৭৮৯ খ্রিস্টাব্দে ফরাসি বিপ্লবে দেশের নারীরা কী ভূমিকা পালন করেছিল?

১৭৮৯ খ্রিস্টাব্দের মাঝামাঝি রাজা ষোড়শ লুই স্টেটস জেনারেলের অধিবেশন ডাকলে বুর্জোয়ারা সেখানে তিন সম্প্রদায়ের একত্রে অধিবেশনে বসা এবং সদস্যদের মাথাপিছু ভোটের দাবি জানায়। বিপদগ্রস্ত রাজা বাধ্য হয়ে তা মেনে নিলেও খুব শীঘ্রই মূল্যবৃদ্ধি, খাদ্যাভাব প্রভৃতি ঘটনাকে কেন্দ্র করে তৃতীয় শ্রেণির লোকেরা বিপ্লবে ঝাঁপিয়ে পড়ে।

ফরাসি বিপ্লবে নারীদের অংশগ্রহণ তৃতীয় শ্রেণির অন্যতম দরিদ্র নারীরা ফরাসি বিপ্লবে ব্যাপকভাবে অংশ নেয়।

[1] খাদ্যাভাব: ১৭৮৯ খ্রিস্টাব্দের দ্বিতীয় ভাগে ফ্রান্সের গ্রামাঞ্চলে খাদ্যাভাব চরম আকার ধারণ করে। খাদ্যের দাবিতে প্যারিসে দাঙ্গা-হাঙ্গামা শুরু হয়। এই পরিস্থিতিতে খাদ্যের দাবিতে প্রায় ৬ হাজার মহিলা ৫ অক্টোবর প্রবল বৃষ্টিপাত উপেক্ষা করে মিছিল করে ভার্সাই রাজপ্রাসাদ অভিযান করে। ‘রুটি চাই’ ধ্বনিতে মিছিল মুখরিত হয়। লাফায়েৎ-এর নেতৃত্বে জাতীয় রক্ষীবাহিনীর ২০ হাজার সদস্য এই মিছিল অনুসরণ করে এগোতে থাকে।

[2] রাজতন্ত্রের শবযাত্রা: আন্দোলনকারী নারীরা ৬ অক্টোবর রাজপ্রাসাদের রক্ষীদের হত্যা করে এবং সমগ্র রাজপরিবারকে বন্দি করে প্যারিসে আসতে বাধ্য করে। ঐতিহাসিক রাইকার এই ঘটনাকে ‘রাজতন্ত্রের শবযাত্রা’ বলে অভিহিত করেছেন।

উপসংহার: ফরাসি বিপ্লবে সেদেশের নারীরা তাদের সক্রিয়তার প্রমাণ দেয়-এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। বিপ্লবের মধ্যে দিয়ে তারা বাবা মায়ের অনুমতি ছাড়া বিয়ে করা, অবৈধ সন্তানের স্বীকৃতি লাভ, রাজনৈতিক ক্লাব গঠন প্রভৃতি বিভিন্ন অধিকার লাভ করে।

৯। জ্যাকোবিন শাসনের পরিচয় দাও।

বিপ্লবের সময়ে ফ্রান্সের উগ্র বামপন্থী রাজনৈতিক দল ছিল জ্যাকোবিন দল। এই দলের নেতৃবৃন্দের মধ্যে অন্যতম ছিলেন রোবসপিয়ার, দাঁতোঁ, ম্যারাট প্রমুখ।

জ্যাকোবিন শাসন

[1] দলের আদর্শ: জ্যাকোবিন দল সম্পত্তির ভিত্তিতে নাগরিকের ভোটাধিকারের বিরোধিতা করে। রাজতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে দেশে প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা এই দলের মূল লক্ষ্য ছিল। জ্যাকোবিনরা রুশোর সমাজতান্ত্রিক আদর্শে বিশ্বাসী ছিল। দরিদ্র শ্রেণির মানুষের মধ্যে এই দলের ব্যাপক জনপ্রিয়তা ছিল।

[2] জিরন্ডিস্টদের বিতাড়ন: জ্যাকোবিনরা প্যারিসের সর্বহারা জনতার সহায়তায় আইনসভা থেকে জিরন্ডিস্টদের বিতাড়িত করে এবং শাসনব্যবস্থায় একাধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে, রাজতন্ত্রের অবসান ঘটায়।

[3] সন্ত্রাস: দেশের সংকটকালে জ্যাকোবিন দলের নেতৃত্বে ফ্রান্সে সন্ত্রাসের শাসন শুরু হয়। তারা বিপ্লবী ফ্রান্সকে রক্ষার নামে নির্বিচারে বহু মানুষকে হত্যা করে। রাজপরিবারের প্রায় সকলকে গিলোটিনে হত্যা করা হয়। জ্যাকোবিন নেতা হিবার্ট বলেন, “নিরাপত্তার প্রয়োজনে সকলকে হত্যা করতে হবে।” জ্যাকোবিন দল তিনটি সংস্থার সহায়তায় দেশে স্বেচ্ছাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে, যথা-জ্যাকোবিন ক্লাব, বিপ্লবী কমিউন ও কনভেনশন কমিটি।

[4] জনকল্যাণ: সন্ত্রাসের শাসনকালে জ্যাকোবিন দল বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক পদক্ষেপ নেয়। [i] মজুতদারি বন্ধ করার উদ্দেশ্যে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়। [ii] নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর সর্বোচ্চ মূল্য এবং মজুরির সর্বনিম্ন হার বেঁধে দেওয়া হয়। [iii] দাসপ্রথার অবসান ঘটানো হয়। [iv] অভিজাতদের জমি বাজেয়াপ্ত করে কৃষকদের বণ্টন করা হয়। [v] অবৈতনিক সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা চালু করা হয়। [vi] খ্রিস্টান বর্ষপঞ্জি বাতিল করে ‘প্রজাতান্ত্রিক বর্ষপঞ্জি’ চালু করা হয়।

উপসংহার: বিপ্লবের কালে ফ্রান্সে টানা তেরো মাস জ্যাকোবিন দলের শাসন চলে। এই পর্বে অহেতুক ভীতি প্রদর্শন, সন্ত্রাস ও ব্যাপক হত্যাকাণ্ড চলে। তাদের এই শাসন ‘সন্ত্রাসের রাজত্ব’ নামে পরিচিত।

১০। ফরাসি বিপ্লবের প্রসারে গুজবের প্রভাব উল্লেখ করো। অথবা, ফরাসি বিপ্লবে ‘মহাতঙ্ক’-এর বিবরণ দাও।

ফ্রান্সের গ্রামাঞ্চলে শোষিত ও নির্যাতিত দরিদ্র কৃষকরা সামন্ত প্রভুদের ‘করভি’ বা বেগারশ্রম-সহ বিভিন্ন সামন্তকর, রাজাকে ‘টাইলে’ বা ভূমিকর, গির্জাকে ‘টাইদ’ বা ধর্মকর প্রভৃতি দিতে বাধ্য হত। এজন্য কৃষকরা তাদের নিকটস্থ প্রভু গ্রামীণ সামন্তপ্রভু ও অভিজাতদের ওপর অত্যন্ত ক্ষুব্ধ ছিল।

গুজবের প্রভাব: মহাতঙ্ক

[1] গ্রামাঞ্চলে বিদ্রোহ: টেনিস কোর্টের শপথের (২০ জুন, ১৭৮৯ খ্রি.) পর থেকে ফ্রান্সের গ্রামাঞ্চলে রাজতন্ত্র ও সামন্ততন্ত্রের বিরুদ্ধে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। গ্রাম থেকে হাজার হাজার মানুষ খাদ্যের দাবিতে প্যারিসে এসে সর্বহারা মানুষের সঙ্গে যোগ দিলে পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে। প্যারিসের উত্তেজিত জনতা ১৭৮৯ খ্রিস্টাব্দের ১৪ জুলাই কুখ্যাত বাস্তিল দুর্গ আক্রমণ করে দুর্গের পতন ঘটায়।

[2] মহাতঙ্ক: প্যারিসের উত্তাল পরিস্থিতিতে ফ্রান্সের গ্রামাঞ্চলে কৃষকদের মধ্যে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি হয়। এই সময় গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে, কৃষকদের শায়েস্তা করার উদ্দেশ্যে রাজকীয় সেনাবাহিনী ও অভিজাতদের ভাড়াটে গুন্ডা গ্রামের দিকে এগিয়ে আসছে। এই গুজব ‘মহাতঙ্ক’ (‘Great Fear’) নামে পরিচিত।

[3] বিদ্রোহের ব্যাপকতা: মহাতঙ্কের ঘটনার পর ফ্রান্সের গ্রামাঞ্চলে ভয়ংকর কৃষক বিদ্রোহ শুরু হয়। বিদ্রোহী কৃষকরা জমিদার ও তাদের কর্মচারীদের গ্রাম থেকে বিতাড়িত করে, তাদের খামারবাড়ি ও গির্জা ধ্বংস করে, ঋণপত্রগুলি পুড়িয়ে দেয় এবং পশুচারণভূমি দখল করে নেয়। বিদ্রোহের আতঙ্কে প্রায় ২০ হাজার যাজক ও অভিজাত ব্যক্তিরা ফ্রান্স ছেড়ে বিদেশে পালিয়ে যায়। এর ফলে গ্রামাঞ্চলে ‘পুরাতনতন্ত্র’ প্রায় ভেঙে পড়ে।

উপসংহার: বিপ্লব সংঘটিত হওয়ার পূর্বে যেসব গুজব ছড়িয়েছিল তা ফরাসি বিপ্লবকে ত্বরান্বিত ও শক্তিশালী করে। সমাজের নিম্নস্তরে যেখানে দার্শনিকদের মতামত পৌঁছাতো না, সেখানে গুজবগুলিই বিপ্লবের অগ্নিস্ফুলিঙ্গ হয়ে উঠেছিল।

আরো পড়ুন : একাদশ শ্রেণির দ্বিতীয় সেমিস্টার ইতিহাস সাজেশন 2025

আরো পড়ুন : একাদশ শ্রেণির দ্বিতীয় সেমিস্টার রাষ্ট্রবিজ্ঞান সাজেশন 2025

আরও পড়ুন প্রয়োজনে
বিপ্লবী আদর্শ নেপোলিয়নীয় সাম্রাজ্য ও জাতীয়তাবাদ প্রশ্ন উত্তর ক্লাস নাইন ইতিহাস | Class 9 History 2nd Chapter Question Answer Click here
নবম শ্রেণি ইতিহাস সাজেশন ২০২৬ | Class 9 History Suggestion 2026 Click here
দশম শ্রেণি ইতিহাস প্রথম অধ্যায় ইতিহাসের ধারণা প্রশ্ন উত্তর | Class 10 History First Chapter Question Answer Click here
Madhyamik History Suggestion 2025-2026 Click here

Leave a Comment